Showing posts with label Literature. Show all posts
Showing posts with label Literature. Show all posts

Monday, 26 March 2018

Social life in Charyapada / Literary value of charyapada

চর্যাপদে বর্ণিত সমাজ জীবনঃ-

কোন যুগের সাহিত্যই সমাজ নিরপেক্ষ নয়। চর্যাগীতির রচয়িতা সিদ্ধাচার্যগণ ব্যক্তিগত সাধনা আর সহজানন্দ উপলব্ধিকে তার নিজস্ব শিল্পের রীতিতে প্রকাশ করেছেন। সাধনা প্রত্যয়ের দিক থেকে সমস্ত চর্যাগান এর বিষয়বস্তু একই ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুস্নার কথা। কিন্তু সেই সাধন প্রনালী প্রত্যেক সাধকের আপন অনুভূতির রসে বৈচিত্র‍্য মন্ডিত হয়ে উঠেছে। তৎকালীন সাধারণ বাঙালির প্রতিদিনের ধূলিধূসরিত জীবন চিত্র, সুখ দুঃখ, হাসি কান্নার টুকরো টুকরো রেখাচিত্র জীবন্ত হয়ে উঠেছে এই সমস্ত পদগুলিতে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মনীন্দ্র মোহন বসুর উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য;- " যেহেতু কোন কবিই পারিপার্শ্বিকতাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করিতে পারে না, কখনও সচেতন, কখনও অচেতনভাবে পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব স্বীকার করিয়া বসেন। সেই জন্য চর্যার রচয়িতাগণ ও তাদের বাস্তব পরিমণ্ডলকে মাঝে মাঝে আভাসিত না করিয়া পারেন না।"

(১) ভৌগোলিক পরিবেশ:- 

চর্যাগীতি তে যে সমস্ত উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে তাতে বাংলাদেশের নানা প্রসঙ্গের অবতারণা করা হয়েছে। চর্যাপদে খাল-বিল, নদী-নালা, বিশেষত নৌকা যাত্রার অতিরিক্ত উল্লেখ থাকায় নদীমাতৃক বাংলাদেশেরই কথায় সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেমন কবি লিখেছেন;-"ভবণ ই গহণ গম্ভীর বেঁগে বাহী।/ দু আন্তে চিখিল মাঁঝে ন থাহী।।"

(২) সমাজ বিন্যাস:- 

চর্যাগীতিতে চিত্রিত সমাজচিত্রের রুপটি প্রধানত হিন্দু সমাজের। সেই সমাজের উঁচু শ্রেনীতে ব্রাহ্মণ এবং নিম্ন শ্রেণীতে ডোম, চন্ডাল, শবরদের অবস্থান ছিল। প্রকৃতপক্ষে চর্যাপদে নিম্ন শ্রেণীর জীবন কথাই বর্ণিত হয়েছে। বর্ণাশ্রম প্রথা কঠোরভাবে বিদ্যমান ছিল। নিম্ন শ্রেণীর মানুষেরা সভ্য সমাজ থেকে দূরে বসবাস করত। তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায় কাহ্নপাদের একটি পদে;-" নগর বাহিরে ডোম্বী তোহোরি কুড়িআ।/ছোই ছোই জাহসো ব্রাহ্ম নাড়িআ।।" ইত্যাদি পদে।

(৩)জীবিকা:- 

চর্যাগীতিতে যে ক'টি জীবিকা বা বৃত্তির ইঙ্গিত আছে, পা খুব একটা উচ্চমানের নয়। কায়িক পরিশ্রমই ছিল তাদের প্রধান সম্পদ। যেমন, কেউ কেউ ঝুড়ি,চাঙ্গড়ি, চুপড়ি ইত্যাদি তৈরি করত। এমন কি ডোম্বীরা খেয়া পারাপারের কাজ ও করত। শুধু তাই নয়, মাদুর বোনা, কাপড় বোনা, মাছ ধরা, মদ চোলাই করার কথা ও চর্যাগানে আছে। এমন কি হরিণ শিকার ও বাণিজ্য যাত্রার কথা ও জানা যায়। হরিণ শিকারের কাহিনীতে পুশু জীবনের অব্যক্ত মর্ম যন্ত্রণার ক্রন্দন ধ্বনিত হয়েছে;- " আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী।/খনহ ন ছাড় অ ভুসুকু অহেরী।।"

(৪) পারিবারিক জীবন যাপন:-

চর্যা যুগে পারিবারিক জীবন ছিল একান্নবর্তী শশুর, শাশুড়ি, ননদ, পুত্রবধূকে নিয়ে বিরাট সংসার। তবে সমাজের কোন কোন স্তরে ব্যভিচার ছিল।

(৫) আমোদ-প্রমোদ:- 

সেকালের মানুষেরা খেলাধুলার মাধ্যমে অবসর সময় কাটাতো। খেলাধুলার মধ্যে দাবা খেলা ছিল জনপ্রিয়;-"করুণা পিহাড়ি খেলহুঁ নববল"। এছাড়াও নাটক ও নৃত্য গীতের প্রতি বাঙালির বিশেষ একটা ঝোঁক ছিল। মেয়েরা নৃত্যগীতে খুব নিপুণা ছিল। চর্যাপদে বন্ধু নাটক ও অভিনয়ের কথা উল্লেখ আছে;-" বন্ধু নাটক বিসমা হোই"।। নগরের ধনী ব্যক্তিরা ছিল বিলাসী। তারা পালঙ্কে শুয়ে কপ্পুর মেশানো পান খেতেন। সে সময় মদ্যপানে রেওয়াজ ছিল খুবই জোরদার।

(৬) বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়:- 

চর্যার সময়ে বৈদিক আচার-অনুষ্ঠানের প্রচলন ছিল। তখনকার ব্রাহ্মণ,দন্ডী, জৈন, সন্ন্যাসী প্রভৃতিদের প্রতি চর্যাকারেরা কটাক্ষ করেছেন। সিদ্ধাচার্যের মাপে ব্রাহ্মণরা বেদের কিছুই  বোঝেনা। চর্যাপদের একটি পদে আছে;-"সু অল সমাহি অ কাহি করিঅই।/সুখদুখেঁতে নিচিত মরিঅই"।।

যাই হোক যুগান্তরে পরেও চর্যাপদের মধ্যে সদ্য মুকুলিত বাংলা ভাষায় অঙ্কিত সমাজ ও সংসার চিত্র অম্লান আছে। কবিগণ আধ্যাত্ম পথের যাত্রী হয়েও বিস্মৃত হতে পারেননি জীবনের মূল স্রোত থেকে। চর্যার বিষয়বস্তু বা লক্ষ্য আধ্যাত্মিক হলেও এর জীবনবোধের উৎস সম্পূর্ণরূপেই লৌকিক জগতের বিষয়।একারণেই চর্যাপদে সেই সময়কার বাস্তব সমাজ জীবনের ছবিকে দেখতে পায়।

চর্যাপদের সাহিত্যমূল্য:-

সাহিত্যের অপর নাম জীবনবেদ। চর্যাপদ গুলির অবলম্বিত বিষয়, মোটেই সাহিত্যোচিত রস বস্তু নয়। বৌদ্ধ সহজিয়ারা তাদের সাধন তত্ত্ব প্রণালী এগুলি উপজীব্য। ধর্মকেন্দ্রিক রচনা হলেও চর্যাপদ গুলি হয়ে উঠেছে সাহিত্য সম্পদে সমৃদ্ধ। ধর্মীয় দার্শনিক তত্ত্ব কে কাব্যরূপ দেওয়ার ক্ষমতা নিঃসন্দেহে উচ্চাঙ্গের কবি প্রতিভার নিদর্শন। চর্যাপদের কবিদের ছন্দ, শব্দ যোজনা এবং অলঙ্কারের ব্যবহার প্রশংসনীয়। শ্লেষ, অনুপ্রাস, উপমা-রূপক ইত্যাদি অলংকারের সার্থক প্রয়োগ চর্যাপদে শিল্প সমুজ্জ্বল রূপ পেয়েছে।

(১) অলংকার:-

সিদ্ধাচার্যগণ চর্যাপদ শুধুমাত্র তত্ত্বই পরিবেশন করতে চেয়েছেন। সন্ধ্যা ভাষার আড়ালে তারা শব্দের লক্ষণা শক্তিকে আবিষ্কার করেছিলেন। এবং পদগুলিতে আমরা উপমা, বিপরীত ভাষণ ইত্যাদি অলংকারের সন্ধান পায়। যেমন;-"নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী।/বুদ্ধ নাটক বিষমা হোই।।" এখানে নাচন্তি ও গান্তি শব্দের সংযুক্ত ব্যঞ্জন 'ন্ত' ক্রমানুসারে ধ্বনিত হয়, এটি ছেকানুপ্রাসের উদাঃ।

(২) তাল এবং ছন্দ:-

চর্যাপদ গুলি গান এবং কবিতা আকারে সজ্জিত। প্রতিটি কবিতার শিরোনামে রাগের উল্লেখ আছে। বেশিরভাগ পদই রচিত হয়েছিল প্রত্নমাত্রাবৃত্ত ছন্দে। তাতে রুদ্ধদল ও দীর্ঘস্বর দ্বিমাত্রিক। যেমন;-"কা আ ত রু ব র/প ঞ্চ বি ডা ল"(৮+৮)।।

(৩) চিত্র ধর্ম, সংগীত ধর্ম এবং গীতি প্রাণতা:-

হৃদয় উৎসারিত অনুভূতির প্রকাশ করতে গিয়ে নতুন নতুন চিত্র কল্পনা, সাধন প্রনালী ও রূপ রচনা করেছেন এই বৌদ্ধ মঠের সাধকেরা। এসকল চিত্ত কল্পনায় বর্ণনীয় বস্তুতে লাবণ্য ও সৌন্দর্য ব্যক্ত করে চর্যাপদকর্তাগণ অনন্য কবিত্বশক্তির পরিচয় দিয়েছেন। এছাড়াও প্রত্যেকটি পদে গীতি প্রাণতা লক্ষণীয়। যেমন;-"উঁচা উঁচা পাবত তঁহি বসই সবরী বালী।/মোরঙ্গি পীচ্ছ পরিহণ সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী।।" মনীষী হার্ডসনের মতে;- " Personal or subjective poetry or the poetry self expressions or self delineation."

(৪) ছোট ছোট গল্প বা কাহিনী প্রসঙ্গ:-

চর্যাপদের বিভিন্ন পদে আমরা ছোট ছোট গল্প ও কাহিনীর প্রসঙ্গ খুঁজে পায়। সেগুলি আজকের গল্পের মত না হলেও মূলত কাহিনীর মূলসূত্র পাওয়া যায়। যেমন;-" টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী/ হাঁড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী

(৫) সাহিত্যরস:-

চর্যাপদ হল আধ্যাত্ম সংগীত। এজন্য শান্ত রস হল এর প্রধান রস। এছাড়াও করুণরস, হাস্যরস ও অদ্ভুত রসের সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন;- "দুলি দুহিপিটা ধরণ ন জাই।/রুখের তেন্তুলি কুম্ভিরে খা অ।।"

(৬) প্রবাদ প্রবচন:-

বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য চর্যাপদকর্তাগণ কোন কোন বিষয় চর্যাপদের মধ্যে চিরন্তন যুক্তি ও প্রবাদ বাক্যের মর্যাদা দিয়েছেন। যেমন;-" আপনা মাংসে হরিণা বৈরী।" নিজের সুস্বাদু মাংসের জন্য হরিণ নিজের শত্রু।

(৭) ধাঁধা প্রসঙ্গ:-

সন্ধ্যাভাষার আড়ালের মধ্যে দিয়ে চর্যাকারেরা চর্যাপদে ধাঁধার ব্যবহার করেছেন। যেগুলি আমাদের ধাঁধিয়ে দেয়। যেমন;-"জো সো বুধি সোই নিবুধী।/জো সে চোর সোই সাধী।।"

(৮) মিষ্টিক কবিতা:-

তত্ত্ববাদী সাধকেরা ছিলেন জীবন প্রেমিক কবি। তত্ত্ব প্রধান হলেও চর্যাপদের তত্ত্ব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এই জীবন চিত্রগুলি  লোকজগতের অভিজ্ঞতা, লোক চরিত্র চিত্র দক্ষতা নয়, জীবনরস রসিকতায় ভাষ্য। চর্যাপদ জ্ঞানের বিষয় নয়- ভাবের বিষয়, তত্ত্বের মৃণালে কাব্যের শতদল।



History of Buddhism / Described theoretical theory of Charyapada

বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস


বৌদ্ধ ধর্ম মোটামুটিভাবে দু'ভাগে বিভক্ত- হীনযান বৌদ্ধ ধর্ম ও মহাজান বৌদ্ধ ধর্ম। বুদ্ধদেব নিজে কোন রূপ ধর্মগ্রন্থ রচনা করে যাননি। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর উপদেশাবলী সংগ্রহ করার জন্য প্রথমত রাজগৃহ একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর প্রায় এক বছর পর বৈশালীতে দ্বিতীয় সভার অধিবেশন হয়। এরপরে মহারাজ অশোকের আমলে পাটালিপুত্রে তৃতীয় সভা এবং মহারাজ কনিষ্কের রাজত্বকালে চতুর্থ সভার অধিবেশন হয়েছিল। এইসকল ধর্মসভায় বুদ্ধদেবের উপদেশ অবলম্বন করে বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থ রচিত হয়েছিল। এর মধ্যে সূত্র, বিনয় ও অভিধর্ম নামক তিন পিটক বা পেটিকা নামক সংগ্রহ গ্রন্থই প্রধান। এই সকল গ্রন্থই পালি ভাষায় রচিত। গ্রন্থ গুলির সন্ধান সিংহল, ব্রহ্ম, ও শ্যাম প্রভৃতি দেশে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের দর্শনের যে বিবরণ পাওয়া যায় তাকেই প্রাচীন মতেই নাম হল হীনযান। এরপর খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকের দিকে মহাযান- সম্প্রদায়ের অভ্যুত্থান ঘটে। নাগার্জুন, অসঙ্গ, বসুবন্ধু প্রভৃতির আচার্যগণ প্রাচীন শাস্ত্রের ব্যাখ্যা করে সংস্কৃত ভাষায় তাদের মতামত প্রচার করেছেন। এই হল মহাযান মত। তিব্বত, চীন, জাপান প্রভৃতি দেশে এই মত বিস্তৃতি লাভ করে।


হীনযান ও মহাযান:

হীনযান ও মহাযান সম্প্রদায় মধ্যে বিরোধ চরম আদর্শ, উপদেশ, উপদেশের প্রয়োগ, সাধনার আলম্বন ও সাধন কালের পরিমাণ নিয়ে। এসকল বিষয়ে প্রাচীনেরা হীন ছিলেন বলেই তারা হীনযানী। প্রাচীন স্থবির বাদী বা থেরবাদীদের চরম আদর্শ ছিল- শূন্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে নির্বাণ অবলম্বন করে অর্হত্ত লাভ করা। কিন্তু মহাযানীদের উদ্দেশ্য ছিল আরোও উদার। তাঁরা বললেন;-" নির্বাণ লাভ করে 'অর্হৎ' হলে চলবে না; দুঃখ প্রপীড়িত বিশ্ব জীবের মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আত্ম মুক্তির ত্যাগ করতে হবে, নির্বাণ লাভের উপযুক্ত হলেও নির্বাণ ত্যাগ করে শূন্যতায় প্রতিষ্ঠিত থেকেই মহা করুণা অবলম্বনে বিশ্ব জীবের মুক্তির জন্য অনন্তকাল ধরে কুশল কর্ম করে যেতে হবে এটাই হল মহাযানীর পথ"।।

বজ্রযান ও সহজযান:

বিভিন্ন ধরনের ধর্মবিশ্বাস ও প্রচলিত সাধন পদ্ধতি ক্রম প্রবেশের ফলে মহাযান মত পরিবর্তিত ও বিশ্লিষ্ট হয় দেখা দিল দুটি মত- 'পারমিতানয়' ও 'মন্ত্রনয়'।'পারমিতানয়'  পরিকল্পিত মহাযানের বিশুদ্ধ দার্শনিক তত্ত্ব আশ্রয় করে। আর 'পারমিতানয়'এ অনুশীলনের উপরে গুরুত্ব না দিয়ে বিভিন্ন প্রকারের মন্ত্রের উপরে গুরুত্ব আরোপ করে সৃষ্ট  হল 'মন্ত্রনয়'। আবার এই 'মন্ত্রনয়' এর সঙ্গে নানা প্রকার দেবদেবীর পূজার্চনা, ধ্যান-ধারণা, তান্ত্রিক ক্রিয়া বিধি,গুহ্য যোগ সাধনা ইত্যাদি প্রযুক্ত হয় বজ্রযান উদ্ভূত হল। 'বজ্র' শব্দের বৌদ্ধ তান্ত্রিক অর্থ শূন্যতা, বজ্রযান তাই শূন্যতা-যান। আর অন্যদিকে বজ্রযান পন্থী একদল সাধকের কতকগুলি বিশিষ্ট মত ও সাধন পদ্ধতি অনুসরণ করে পরবর্তীকালে সহজযান নামক এক বিশেষ  সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। এদের সাধ্য ও সহজ, সাধন ও সহজ; তাই এরা সহজিয়া সাধক রূপে খ্যাত. সহজ শব্দে অর্থ হল সহ-জাত। যে ধর্ম প্রত্যেক জীব বা বস্তুর জন্ম থেকেই উৎপন্ন তারাই বিরাজ করে। সহজিয়াগণের মূল আদর্শ এই সহজ রূপকে উপলব্ধি করে মহাসুখে মগ্ন হওয়া। এছাড়াও সহজিগণ কখনো ও সাধনার জন্য বক্রতা অবলম্বন করতেন না- সহজ সরল পথই তাঁদের সাধন জীবনের একমাত্র অবলম্বন।

চর্যাপদে বর্ণিত সাধন তত্ত্ব:

বৌদ্ধ সহজিয়াগণের সাধনা মূলত তান্ত্রিক সাধনা। তন্ত্র সাধনা হল দেহ-সাধনা- দেহকে যন্ত্র করে তার ভেতরেই পরম সত্যকে উপলব্ধি করার সাধনা। তান্ত্রিকদের মতে দেবো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্র রূপ- ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যা কিছু সত্য নিহিত আছে তা এই দেহভান্ডের মধ্যে ও রয়েছে। সহজিয়াগণ বলেন, দেহের মধ্যে অবস্থান করছে যে সহজ স্বরূপ তাই হল বুদ্ধ -স্বরূপ। চর্যাপদ গুলির মধ্যে এই তন্ত্র সাধনা তথা দেহ সাধনার কথা বহুস্থলে উল্লিখিত হয়েছে। পদকর্তাগণ বারবার বলেছেন-"নিঅড়ি বোহি মা জাহুরে লাঙ্ক"। অর্থাৎ এই দেহেই আছে বোধি তাকে লাভ করার জন্য লঙ্কায় যাবার প্রয়োজন নেই। সহজিয়য়াগণ দেহের মধ্যে চারটি চক্র বা পদ্ম কল্পনা করেছেন। প্রথম চক্র অবস্থিত নাভিতে, যাকে বলা হয় 'নির্মাণ চক্র'। দ্বিতীয় চক্র হৃদয়ে, যাকে বলা হয় 'ধর্মচক্র'। তৃতীয় চক্র কন্ঠে, যাকে বলা হয় 'সম্ভোগ চক্র'। এবং চতুর্থ চক্রের অবস্থান মস্তকে, যাকে বলা হয় 'সহজচক্র বা মহাসুখচক্র'। যোগসাধনার দিক থেকে দেখা যায় এই দেহের মধ্যে তিনটি প্রধান নাড়ী আছে। একটি 'বামগা', প্রাণবাহী শ্বাসবাহী নাড়ী( হিন্দু তন্ত্র মতে -ইড়া ) বলা হয়। অপরটি 'দক্ষিণগা',প্রশ্বাসবাহী নাড়ী(হিন্দু তন্ত্র মতে- পিঙ্গলা) বলা হয়। এবং আরেকটি নাড়ী আছে তার নাম হলো 'মধ্যগা'নাড়ী, যাকে (বৌদ্ধ তন্ত্র মতে অবধূতিকা বা হিন্দু তন্ত্র মতে -সুষুম্না বলা হয়)। সাধনার ক্ষেত্রে বামগা- দক্ষিণগা এই নাড়ী দুটিকে শূন্যতা- করুণা, প্রজ্ঞা -উপায়, নিবৃত্তি-প্রবৃত্তি, গ্রাহক- গ্রাহ্য, আলি- কালী, দিবা-রাত্রি, চন্দ্র-সূর্য, ভব- নির্মাণ ইত্যাদি অনেক নামে অভিহিত করা হয়েছে। এই নাড়ী দুটি দ্বৈত তত্ত্বের প্রতীক। তৃতীয় নাড়ীটি( অবধূতি বা অবধূতিকা)অদ্বয় বোধিচিত্ত বা সহজানন্দ লাভের জন্য মধ্য মার্গের প্রতিক। চার্যার বহু স্থানে নানাভাবে এই মধ্যপথে কথা বলা হয়েছে। কারণ বৌদ্ধ সহজিয়াগণের আসল সাধনা হল- সর্ব প্রকারের দ্বৈতবিবর্জিত হয়ে অদ্বয় মহাসুখে বা সহজরূপে প্রতিষ্ঠিত থাকা। তন্ত্র সাধন মতে প্রথমে বামা ও দক্ষিণা নাড়ী দুটিকে নিঃস্বভাবীকৃত করতে হবে।এদের "ক্রিয়াধারা স্বাভাবিক ভাবে নিম্নগা; এই নিম্নগা ধারাকে যোগের সাহায্যে প্রথমে বিশুদ্ধ করিয়া রুদ্ধ করিতে হইবে- তাহার পরে সমস্ত ধারাকে একীকরণের সাধনা; যখন সব ধারা একীকৃত হইল মধ্যমার্গে- তখন সেই মধ্যমার্গে তাহাকে করিতে হইবে উর্দ্ধগা। সেই উর্দ্ধগা ধারায় আনন্দধারা, সেই আনন্দের মধ্যে অনুভূতি তারতম্য আছে; প্রথমে যে উর্ধ স্পন্দনাত্মক আনন্দনাভূতি তাহার নাম আনন্দ,- দ্বিতীয়ানুভূতি হইল পরমানন্দ- তৃতীয়ানুভূতি বিরামানন্দ- চতুর্থানুভূতি হইল সহজানন্দ। এই চতুর্থানুভূতি সহজানন্দই  হইল চতুর্থশূন্য- প্রকৃতি  প্রভাস্বর সর্বশূন্য।  বোধিচিত্ত  উষ্ণীষ কমলস্থিত চন্দ্র,- সহজানন্দেই ঘটে সেই চন্দ্র হইতে অমৃত ক্ষরণ"।। (ডঃ শশীভূষণ দাশগুপ্ত)




Literature / Literature written before the development of language

   সাহিত্য


“সাহিত্য” শব্দের  মধ্যে রয়েছে “সহিত” কথাটি । “সহিত” শব্দটি থেকে সাহিত্যের উৎপত্তি। অর্থাৎ ধাতুগত অর্থ ধরলে সাহিত্য শব্দের মধ্যে একটি মিলনের ভাব দেখতে পাওয়া যায়, সে যে কেবল ভাবে-ভাবে, ভাষায়-ভাষায়, গ্রন্থে-গ্রন্থে মিলন তা নয়, -“ মানুষের সহিত মানুষের, অতীতের সহিত বর্তমানে, দূরের সহিত নিকটে, অত্যন্ত অন্তরঙ্গ যোগসাধন। সাহিত্য ব্যাতিত আর কিছু তারই সম্ভব নহে”। বস্তুত; “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানবচরিত্র মানুষের হৃদয়ের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারন করিতেছে, যে সংগীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষায় রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য”।। ( সাহিত্যের তাৎপর্য ) সুতারাং , “নিজের কথা, অপরের কথা, বিশ্বজগতের কথা, সাহিত্যিকের মনোবীনায় যে সুরের ঝংকার তোলে তাঁর শিল্পসম্মত প্রকাশের নাম সাহিত্য”।।

* নিজের কথা বলতে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি ভালোলাগা ও ভালোবাসা।।

* অপরের কথা বলতে কবির নিজের কথা নয়, অপরের কথায় পরিবেশিত করেছে  তার জারক রসে জারিত করে।।

* বিশ্বজগতের কথা বলতে কবি এখানে বাইরের ভূখণ্ডের আশেপাশের অবস্থার কথা বলেছে।।

* সাহিত্যর মনোবীনায় যে সুরের ঝংকার তোলে বলতে কোনো বিষয় সাহিত্যিকের অন্তরের অনুভূতি স্পর্শ পেয়ে যে রস রূপ নির্মাণ করে তোলে তারই কথা।

                           

সাহিত্যের কাজ

‘সাহিত্যের বিচারক’  প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,- “অন্তরের জিনিসকে বাহিরের ভাবের জিনিসকে ভাষায়, নিজের জিনিসকে বিশ্বমানবের এবং ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলা সাহিত্যের কাজ”। 



সাহিত্যর প্রকাশ

সাহিত্য জিনিসটাই শিল্পসম্মত একটা ব্যাপার। মনের ভাবকে সাহিত্যিকরা বিচিত্র বর্ণের , বিচিত্র রূপের, বিচিত্র ছন্দে প্রকাশ করে থাকেন। এক্ষেত্রে এ প্রসঙ্গে আসে প্রকাশের বাহন সেটা হল অর্থ যুক্ত শব্দ। সাহিত্যের যে শব্দ গুলো হওয়া প্রয়োজন তা হল অলংকার। এবং তার অর্থ যুক্ত শব্দে থাকবে ব্যাঞ্জনা । তবেই এটাই হল সাহিত্য।



Popular