Showing posts with label BENGALI LITERATURE. Show all posts
Showing posts with label BENGALI LITERATURE. Show all posts
Thursday, 29 March 2018
Radha Character of Srikrishna Krittan / রাধা চরিত্র
দান খণ্ডে দেখি কৃষ্ণ বড়াই এর সঙ্গে শলাপরামর্শ করে মথুরার পথে দানী সেজে বসেছে, বড়াই সখী পরিবৃতা রাধাকে ভুলিয়ে সেখানে উপস্থিত করল। কৃষ্ণ রাধা দধি দুগ্ধ সবই নষ্ট করে বলপূর্বক রাধাকে সম্ভোগ করলেন। এবং ছলে বলে কৌশলে রাধার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার অভীষ্ট পূরণ করে। ক্ষোভে অপমানে রাধা কৃষ্ণকে অপমান বা ভৎসনা করে বলেন;-"এক ঠাই বাঢ়িলাহোঁ নান্দের ঘরে।/চন্ডাল কাহ্নাঞি এবে বল করে।।"
নৌকা খণ্ডে দেখি কৃষ্ণ আবার পারের কান্ডারি সেজে যমুনার ঘাটে রাধার সঙ্গে নৌকাডুবি চলে জলকেলি করছে। এখানে রাধার মধ্যে প্রতিকূল বাম্যভাব দূর হলো। এখানে দেখবার তাম্বুল, ফুল দান এবং নৌকা খণ্ডে রাধার মধ্যে যে প্রতিরোধশীল, সেই প্রতিরোধের তীব্রতা প্রায় হ্রাস পেয়েছে।
যমুনা খণ্ডে এসেছে পৌরাণিক প্রসঙ্গ। এই খন্ডের মধ্যে কৃষ্ণের কালিয়া দমন, গোপী গণের সঙ্গী জলবিহার, নারীদের বস্ত্রহরণ ইত্যাদি বিবৃত হয়েছে। রাধা অন্য গোপীগণদের সঙ্গী কৃষ্ণের মেলামেশাকে অপছন্দ করে, এই ঈর্ষাই প্রেমের বড় প্রমাণ।
Wednesday, 28 March 2018
Srikrishnakirtan of Baru Chandidas / বড়ু চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
বড়ু চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
বাংলা ভাষায় রচিত পদাবলী সাহিত্যের আদি কবি রূপে সিকৃতি লাভ করে বড়ু চন্ডীদাস। কৃষ্ণলীলা বিষয়ক একখানি বৃহৎ কাব্যগ্রন্থ তিনিই রচনা করেছিলেন। পুথিটি বসন্তরঞ্জন রায় মহাশয় ১৩১৬ সালে বন বিষ্ণুপুরের নিকটবর্তী কাঁকিল্যা গ্রামের দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের গোয়াল ঘর থেকে সংগ্রহ করেন। দেবেন্দ্রনাথ শ্রীনিবাস আচার্যের দৌহিত্র বংশজাত। পুথি মধ্যে গ্রন্থ রচনাকাল, গ্রন্থের নাম ও কবি পরিচিতি কিছুই পাওয়া যায়নি। পুথিটি তুলট কাগজে লেখা আগাগোড়া খণ্ডিত। এবং এর প্রথম এবং শেষের কয়েকটি পাতা নেই। বসন্তরঞ্জন বাবু কিংবদন্তি ও পূর্ব ঐতিহ্য অনুসরণ করে এর নাম দেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নামকরণের সার্থকতা
বড়ু চন্ডীদাসের কাব্য মধ্যে কোথাও গ্রন্থের নাম উল্লেখ দেখা যায়নি। গ্রন্থটি সম্পাদনকালে বসন্তরঞ্জন রায় নাম দেন'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন'। নামকরণ সম্পর্কে তিনি বলেছেন;-" দীর্ঘকাল যাবৎ চন্ডীদাস বিরচিত 'কৃষ্ণকীর্তন' এর অস্তিত্ব মাত্র শুনিয়া আসিতেছিলাম। এতদিনে তাহার সমাধান হইয়া গেল। আমাদের ধারনা, আলোচ্য পুথিই' কৃষ্ণকীর্তন' এবং সেইহেতু উহার অনুরূপ নাম নির্দেশ করা হইল"। বসন্ত বাবুর এই নামকরণ এযাবৎকাল সকলেই মেনে নিয়েছেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পুঁথির মধ্যে প্রাপ্ত একখানি রসিদ দেখে এই গ্রন্থটির নামকরণের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ জাগে। পুথিটি আড়াইশো বছর আগে বন বিষ্ণুপুরের গ্রন্থাগারে রক্ষিত ছিল। শ্রীকৃষ্ণ পঞ্চানন নামক এক ব্যক্তি পুথিটির ষোলো খানি পত্র (৯৫-১১০ পত্র) গ্রন্থাগার থেকে ১০৮৯ সনের (১৬৮২ খ্রিষ্টাব্দ) ২৬ শে আশ্বিন নিয়ে গিয়েছিলেন এবং আবার তা ২১ শে অগ্রাহায়ণ ফেরত দিয়ে যান। গ্রন্থাগারের জনৈক কর্মচারী একটুকরো তুলট কাগজে তা লিখে রাখেন। এই চিরকুটে পুথির নাম (শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ) উল্লেখিত আছে। কাজেই বসন্ত বাবুর নামকরণ যথার্থ হয়েছে বলে মনে হয় না। আমাদের ধারনা, গ্রন্থটির নাম শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পরিবর্তে 'শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ' হলেই ঠিক হতো।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভাষা
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন গ্রন্থটির আবিষ্কারের ফলে প্রাচীন বাংলা ভাষার মূল্যবান নিদর্শন আমাদের হস্তগত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের সমকালে যা কিছু পরে বিদ্যাপতির পদাবলী, কৃত্তিবাসের রামায়ণ, মালাধর বসু শ্রীকৃষ্ণবিজয় লেখা হলেও এদের প্রাচীন পুঁথি পাওয়া যায়নি। যে গ্রন্থ গুলির নাম বলেছি সেগুলির ভাষা ও নানান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অনেক আধুনিক হয়ে গিয়েছে। সেকারণে, বাংলা ভাষার আদিরূপ চর্যার সঙ্গে এদের তফাৎ অনেকখানি বলেই মনে হয়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পুথি এই দুইয়ের মধ্যে মিলন সেতু রচনা করেছে। পরবর্তীকালের বৈষ্ণব ভাবাদর্শের সঙ্গী শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের মিল না থাকলেও লোকসমাজে এর বিশেষ প্রচলন তেমন ছিল না। মোড়কে রক্ষিত ঔষধের মত এর ভাষা অপরিবর্তিতই থেকে গিয়েছে। ড: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয় শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পুথির ভাষা আলোচনা করে বলেছিলেন, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভাষা ১৫শ শতকের পূর্ববর্তী বলে মনে করেছেন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এর মধ্যে আহ্মি, তোহ্মি, মোক,বাএ, কাহ্ন ইত্যাদি বহু প্রাচীন শব্দ আছে যেগুলি এর প্রাচীনতাকে প্রমাণিত করে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পুঁথির মত প্রাচীন ভাষা মধ্যযুগীয় সাহিত্যে আর কোথাও পাওয়া যায় না।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের বিষয় বস্তু
রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলা অনুসরণ করে বড়ু চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যখানি রচিত হয়। কৃষ্ণের জন্ম থেকে শুরু করে মথুরাগমন, মথুরা হতে ক্ষণিকের জন্য প্রত্যাবর্তন মিলন রাধা কৃষ্ণের মিলন, তারপর কংস বধের জন্য কৃষ্ণের পুনরায় মথুরা গমন ও রাধার বিলাপ - এই কাহিনী বর্ণিত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের মধ্যে। তবে এই কাব্য তেরটি খন্ডে বিভক্ত হয়েছে। রাধা বিলাপের পর পুথিটি খন্ডিত হয়ে যাওয়ায় কাব্যটির শেষ পর্যন্ত বিরহে, না মিলনে শেষ হয়েছিল তা বোঝা যায় না। তবে প্রচলিত রীতি ও অলংকার শাস্ত্রের বিধান অনুসারে রাধাকৃষ্ণের মিলনের মধ্যে কাব্যটি শেষ হওয়া বাঞ্ছনীয়। সেই জন্য মনে হয় গ্রন্থ শেষে হয়তো রাধাকৃষ্ণের পূর্ণ মিলন বর্ণিত হয়েছিল। তবে কবি সর্বত্র যে অলংকার শাস্ত্রের নীতি মেনে চলেছেন এমন কথা বলা যায় না। মাঝে মাঝে তিনি আদি রসের এমন উৎকট প্রকাশ ঘটিয়েছেন যে তাতে রসাভাস সৃষ্টি হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের আখ্যানভাগ মূলত তেরটি খন্ডে বর্ণিত হয়েছে। আমরা বিভিন্ন খন্ড অনুসারে আলোচনা করতে পারি-
(১) জন্ম খন্ড
এই জন্ম খন্ড রাধাকৃষ্ণের আর্বিভাবের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। কংস নিধনের জন্য স্বয়ং বিষ্ণু কৃষ্ণরূপে দৈবকীর উদরে জন্ম নিলেন এবং তাঁর সম্ভোগের জন্য বৈকুন্ঠের লক্ষী সাগরের ঘরে পদুমা উদরে রাধা রূপে জন্মগ্রহণ করলেন।
(২) তাম্বুল খণ্ড
তাম্বুল খণ্ডে এসে রাধাকৃষ্ণের পৌরাণিক বেশ খসে পড়লো। রাধাকৃষ্ণের আচরণ প্রকৃত নরনারীর পর্যায়ে নেমে গেল। রাধা সব সখিগনের সঙ্গে মিলে বড়াই কে নিয়ে চলেছেন বৃন্দাবন থেকে মথুরার পথে। মাথায় দধি সরের পসরা। সখীদের সঙ্গে রস-পরিহাস করতে করতে বড়াই কে পিছনে ফেলে রাধা অনেকদূর এগিয়ে গেলেন। বড়াই তাকে খুঁজতে খুঁজতে অন্যপথে গিয়ে হাজির হল। পথমধ্যে কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা। বড়াই তার কাছে রাধার সন্ধান জিজ্ঞাসা করল। কৃষ্ণ তো রাধাকে চেনেনা তখন ঐ বড়াই রাধার রূপ বর্ণনা করতে লাগলো। তা শুনে কৃষ্ণের মনে রতি ভাব জেগে উঠলো। তিনি রাধা সঙ্গ লাভের জন্য আকুল হয়ে পড়লেন। একারণে রাধার সঙ্গে মিলনের জন্য কৃষ্ণ বড়াই কে অনুনয়-বিনয় করলেন। তারপর ফল তাম্বুল দিয়ে কৃষ্ণ বড়াই এর হাতে দিলেন। বড়াই কৃষ্ণের কথামতো রাধার কাছে ফল তাম্বুল নিয়ে উপস্থিত হলে, কৃষ্ণের সমস্ত কথা শুনে রাধা রুষ্ট হয়ে ফল তাম্বুল সহ লাথি মেরে ফেলে দিলেন। দেখা যায় এই খণ্ডে কৃষ্ণ তিন-তিনবার রাধার জন্য উপহার পাঠালেও বারবার রাধা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
(৩) দান খণ্ড
দান খন্ডে দেখা যায় কৃষ্ণ রাধার প্রতি ব্যভিচার করেছেন। এই খণ্ডে কৃষ্ণ তার মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য বড়াই কে সঙ্গে নিয়ে রাধাকে সম্ভোগ করলেন। কৃষ্ণের কথামত বড়াই রাধাকে ভুলিয়ে মথুরার পথে হাজির করল। সেখানেই কৃষ্ণ দানি সেজে সমস্ত দধি দুগ্ধ নষ্ট করে রাধাকে জোরপূর্বক সম্ভব করলেন।
(৪) নৌকা খন্ড
নৌকা খন্ডে দেখা যায় কৃষ্ণ পারের কান্ডারী সেজে যমুনার ঘাটে অপেক্ষা করে রইলেন এবং পার করার ছলে নৌকা ডুবিয়ে দিয়ে রাধার সঙ্গী জলকেলি তে মত্ত হলো। তবে এখানে রাধার প্রতিকূল বাম্যভাব দূর হলো।
(৫) ভার খন্ড
এই খণ্ডে দেখা যায় রাধা কৃষ্ণের সঙ্গী সঙ্গলাভে আকৃষ্ট। কৃষ্ণ, রাধার সমস্ত দধি দুধের পসরা মাথায় করে নিয়ে ভারী সেজে বৃন্দাবনের দিকে যাত্রা করলেন।
(৬) ছত্র খণ্ড
এই খণ্ডে দেখা যায় রাধা কৃষ্ণের প্রতি একটু আসক্ত। কারণ রৌদ্রের তাপ-জ্বালা নিবারণার্থে রাধা কৃষ্ণের মাথায় ছত্র ধরলেন। এবং রাধা তাকে রতি দানের আশ্বাস দিলেন।
(৭) বৃন্দাবন খন্ড
এই খন্ডে দেখা যায় রাধাকৃষ্ণের সম্পূর্ণ মিলন। রাধা যেমন আকুল কৃষ্ণের জন্য তেমনই কৃষ্ণ ও।
(৮) যমুনা খন্ড ও (৯) কালিয়া দমন খন্ড
যমুনা খন্ডের মধ্যে কৃষ্ণের কালিয়া দমন খণ্ডটি বিবৃত আছে। এছাড়াও এই খণ্ডে গোপীগণের সঙ্গে জলবিহার, গোপীগণের বস্ত্রহরণ বিবৃত হয়েছে।
(১০) হার খন্ড
এই খণ্ডে কৃষ্ণ রাধার হার চুরি করে নিলেন। ফলস্বরূপ রাধা যশোদা সমীপে কৃষ্ণের দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন।
(১১) বাণ খণ্ড
হার খণ্ডে রাধা কৃষ্ণের দুষ্কর্মের জন্য মা যশোদার কাছে নালিশ করলে কৃষ্ণ রাধার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ স্বরূপ রাধাকে মদন বাণে বিদ্ধ করলো।
(১২) বংশী খণ্ড
এই খণ্ডে কৃষ্ণের বাঁশি শুনে রাধার মন বড় ই উতলা হল। বাঁশির সুরে রাধা শরীর আকুল, মন ব্যাকুল হয়ে গেল। বড়াই এর উপদেশে রাধা বংশী হরণ করে নিলেন। এরপর অনেক অনুনয় বিনয় করার পর রাধা কৃষ্ণের বাঁশি ফিরিয়ে দিলেন।
(১৩) রাধা বিরহ
রাধা বিরহ অংশে রাধার নিদারুণ বিরহ দশা উপস্থিত হল। বহু অন্বেষণের পর রাধা কৃষ্ণের সঙ্গে মিলিত হলেন। ক্লান্তি ভরে তিনি কৃষ্ণের ক্রোড়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। এই সুযোগে কৃষ্ণ ও রাধাকে ছেড়ে মথুরা গমন করলেন।
যাইহোক শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের বিষয়বস্তু একটু ভাল করে দেখলে বোঝা যায় কবি তার কাব্য মধ্যে রাধা ও কৃষ্ণ কে প্রকৃত মানব মানবীর আচার-আচরণ কেই তুলে ধরলেন। এখানে দেব মহিমা একেবারেই দ্বিখন্ডিত। বড়ু চন্ডীদাস প্রকৃত বাস্তব জীবনের নিখুঁত নর-নারীর জীবনচিত্রকে যেভাবে আঁকলেন তা মধ্যযুগের কোন কাব্যেই আমরা হয়তো পাবো না। তবে একটা কথা বলবার যোগ্য কবি যে সময়ে এই কাব্যটি রচনা করছেন সেই সময়ের সমাজবাস্তবতার, অর্থনৈতিক চেহারার, নর-নারীর আচার-আচরণ যেন কৃষ্ণ ও রাধার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়।
Monday, 26 March 2018
Language / Historical importance of Charyapada
চর্যাপদের ভাষা:-
বাংলা ভাষার জন্মলগ্নে সাহিত্যিক নিদর্শন চর্যাপদ। বৌদ্ধ সাধকেরা চর্যার ভাষার মধ্য দিয়ে সাধনার গোপনীয়তা কে অনেকটা হেঁয়ালি ভঙ্গিতে ব্যক্ত করেছেন, তাই কোন কোন পন্ডিত এই ভাষাকে সন্ধ্যা ভাষাতে অভিহিত করেছেন। চর্যাপদের ভাষা সম্পর্কে শাস্ত্রী মহাশয়ের বক্তব্য;-" সন্ধ্যা ভাষার মানে আলো-আঁধারি ভাষা, কতক আলো কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায় খানিক বুঝা যায় না"। এই ভাষা সন্ধ্যায় ম্লান গোধুলীলগ্নের মত এক গভীর রহস্য আছে- কতক স্পষ্ট কতক অস্পষ্ট। অর্থাৎ বাইরে এক অর্থ, ভিতর এক অন্য অর্থ; বাইরে সাধারন অর্থ, ভিতরে সুগভীর আধ্যাত্বিকতা। কোন কোন পণ্ডিতদের মতে সন্ধ্যা ভাষা না হয়ে'সন্ধা' ভাষা যার অর্থ অভিপ্রেত বা অধিপ্রায়িক রচনা। যে শব্দের অভিষ্ঠ অর্থ অনুধ্যান করে বুঝতে হয়। যাতে অদীক্ষিত বা অন্য ধর্মাবলম্বীরা সহজিয়া সাধনার গূঢ় রহস্য বুঝতে না পারে এজন্য চর্যাপদকর্তাগণ সন্ধ্যা ভাষা ব্যবহার করেছেন। এই শব্দগুলি সাধন গত কতকগুলি রহস্যপূর্ণ ইঙ্গিত আছে, যা শুধু এই পথের পথিকরাই বুঝতে পারেন। সাধনার গোপনীয়তা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে পাড়া কতকগুলি কায়িক ও বাচনিক সংকেত সৃষ্টি করেছেন, এগুলির মাধ্যমে যোগীরা সম্প্রদায়ভুক্ত অন্য যোগীদের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান করতে বা তত্ত্বকথা আলোচনা করতেন। এই সংকেত এর তাৎপর্য কেবলমাত্র যোগীরাই বোধগম্য ছিল। সন্ধ্যা শব্দের কয়েকটি উদাহরণ দিলে বোধগম্য হবে;- ('হরিনা' শব্দের বাহ্যিক অর্থ মৃগ/ হরিণ, কিন্তু এর সন্ধ্যা অর্থ চিত্ত বা মন।)('করুণা' শব্দের বাহ্যিক অর্থ মৈত্রী, কিন্তু এর সন্ধ্যা অর্থ বোধিচিত্ত)।।
চর্যাপদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:-
সাহিত্য হল জীবনবেদ। মানব জীবনের বিচিত্র সুখ-দুঃখ ও আশা-নিরাশার কাহিনী নিয়ে সাহিত্য গড়ে ওঠে। তাই কোন রচনার ঐতিহাসিক মূল্য আছে কিনা বিচার করতে গেলে দেখতে হবে তা জীবন কাহিনী আশ্রিত কিনা এবং ভাষা, ছন্দ ও অলংকারের সমন্বয়ে সেই রচনা চমৎকারিত্ব লাভ করে রস সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে কিনা। ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম মতবাদ ও দার্শনিকতা, সমাজ চিত্র, সাধন তত্ত্ব সাহিত্যে কাব্যমূল্যের দৃষ্টান্ত স্বরূপে চর্যাপদ ঐতিহাসিক গুরুত্ব লাভ করেছে।
প্রথমত, এ যাবৎ আবিষ্কৃত প্রাচীন যুগের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একমাত্র নিদর্শন।
দ্বিতীয়ত, চর্যাপদকে কেন্দ্র করেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সাহিত্যিক ঐতিহ্যের অভিযান শুরু হয়েছে।
তৃতীয়ত, চর্যাপদের প্রত্যেকটি পদের সূচনায় রাগ রাগিনী, তাল ও লয়ের উল্লেখ আছে। এ থেকে বোঝা যায় চর্যার পদগুলি গান হিসাবে গাওয়া হতো।
চতুর্থত, চর্যাপদের রূপক প্রতীকগুলির মধ্যে তৎকালীন সমাজ জীবন ও রাষ্ট্রনৈতিক জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে।
পঞ্চমত, সংস্কৃত চিত্রাত্মক/ চিত্রধর্মী শ্লোকের বদলে বাংলা গীতি ধর্মী পদ রচনার সূচনা।
ষষ্ঠত, চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রবেশদ্বার স্বরূপ। এই গ্রন্থের ভাষা মাগধী অপভ্রংশ স্তর অতিক্রম করে নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা রূপে সদ্য উদ্ভূত প্রত্ন বাংলাভাষার প্রামাণ্য উপকরণ।
সপ্তমত, বাংলা সাহিত্যেও চর্যার সুদূরপ্রসারী প্রত্যক্ষ প্রভাব ও তাৎপর্যপূর্ণ। চর্যার অনুবৃত্তি দেখা যায় সপ্তদশ শতাব্দীর নাথ সাহিত্য ও বাউল গানে।
চর্যাপদ সাধন বিষয়ক রচনা হলেও মানব জীবনের সুখ-দুঃখের ভিত্তিতেই এর প্রতিষ্ঠা। গভীর মর্ত্য প্রীতি ও জীবন রস রসিকতা তাদের রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রূপ ও অরূপ জগত চর্যাপদে একাকার হয়ে গেছে। এই কারণগুলির জন্য চর্যাপদ ঐতিহাসিক মূল্য লাভ করে।
Context of Charyapada/ Writer of Charyapada প্রসঙ্গঃ চর্যাপদ
প্রসঙ্গঃ চর্যাপদ
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন যা কিছু আবিস্কৃত হয়েছে তার সবই হল ধর্মভাবপুষ্ট পদ্য সাহিত্য। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, প্রাচীন যুগের সাহিত্য নিতান্ত ধর্মচেতনা ও গোষ্ঠীভাব সাধনাকে আশ্রয় করে সৃষ্ট হলেও উদ্দেশ্য প্রচারের প্রবণতাকে অপ্রত্যাশিত ভাবে ছাপিয়ে উঠেছে স্রষ্টার মধুরসিক্ত মননকল্পনা। একারনে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নির্দশনকে ও নিতান্ত প্রাচীন বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এইরকম বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নির্দশন হল চর্যাপদ। এই চর্যাপদ কে নিয়ে দু একটা কথা আলোচনা করা হল -
রাত্রির অন্ধকার শেষ হলে দিনের আলো শুরু হয়। ভোরের প্রথম আলো যখন ফুটে ওঠে তখনও অন্ধকার জড়িয়ে থাকে। সেই আধ আলো আধ অন্ধকারে সবই কেমন অস্পষ্ট লাগে। এই ভোরের অস্পষ্টতায় পাখীরা জেগে ওঠে; তাদের কাকলী ছড়িয়ে দেয় আকাশে – বাতাসে। কিন্তু তাঁদের কলধ্বনির অর্থ সব বোঝা যায় না, কিন্তু তাঁদের আনন্দের অভিব্যাক্তি যে নতুন একটি দিনের শুরু হচ্ছে তারই আগমনী গান শোনা যায়। বাংলা সাহিত্য ও একদিন এমনি করে জন্ম নিয়েছিল। আর সেই জন্মলগ্নে পাখীর অস্পষ্ট কাকলীর মত বৌদ্ধ সাধন সঙ্গীত অপরিণত বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছিল। ওই সময়ে দেশে তখন সংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল। বর্তমান দিনে যেমন শিক্ষিত ওপরের মহলের ইংরেজি ভাষার প্রচলন আছে, সে যুগে ও অভিজাত কিংবা পদস্থ ব্যক্তিদের মধ্যেও সংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল বেশী। সর্ব কাজেই সংস্কৃত ভাষা চলত, সাধারন মানুষ যদিও তার কিছুই বুঝতো না। সবই তাদের কাছে অন্ধকারের মতই অস্পষ্ট থেকে যেত। বাংলা ভাষার প্রথম নির্দশন ‘চর্যাপদ’ বা ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ এই সন্ধিক্ষণে উষার আলোর মত জেগে উঠলো। চর্যাপদ আসলে বিভিন্ন পদকারদের রচিত সংকলন কোষগ্রন্থ। সদ্য জাত বাংলা ভাষাকে কাজে লাগিয়ে সর্বপ্রথম সহজিয়া মঠের বৌদ্ধ সাধকগণ কয়েকটি গান রচনা করেন, যাঁরা এই ধর্মের নতুন দীক্ষা নিচ্ছেন তাঁদের কাছেই নিগূঢ় এই তত্ত্বটি প্রচার করাই ছিল এই রচনার মূল উদ্দেশ্য। এই গানগুলি চর্যাগীতি বা চর্যপদ নামে পরিচিত। এই চর্যাপদ সাধন-ভজন মূলক রচনা এতে সহজিয়া বৌদ্ধ সাধকগণের ধর্ম, তত্ত্বকথা, দর্শন, চিন্তা ও সাধন প্রণালী ব্যক্ত হয়েছে। চর্যাগীতিতে যোগীদের আচার ব্যবহারের নির্দেশ আছে বটে, কিন্তু সেই নির্দেশ আধ্যাত্মিক।
আবিষ্কার ও তত্ত্বপঞ্জী:-
চর্যাপদ শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্যে নয়, নবীন ভারতীয় আর্যভাষা ও সাহিত্যের একটি প্রাচীনতম গ্রন্থ হিসাবে ও বিবেচিত। ডঃ প্রয়াত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় সর্বপ্রথম এই গ্রথের আবিষ্কর্তা। এশিয়াটিক সোসাইটির মেম্বার হিসাবে শাস্ত্রী মহাশয় তিনবার নেপালে যান, পুথি সংগ্রহের জন্য। শেষ একবার নেপালে যাল ১৯০৭ খ্রীঃ। তিনি নেপালের রাজদরবার থেকে তালপাতার লেখা কতকগুলি পুথির সন্ধান পান এবং সেগুলিকে “ হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা” নাম দিয়ে ১৯১৬ খ্রীঃ বাংলায় ১৩২৩ বঙ্গাব্দে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’ থেকে প্রকাশ করেন। এতে মোট চারটি খণ্ড ছিল - চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরোজব্রজের দোহা, কৃষ্ণাচার্যের দোহা ও ডাকার্ণব। শাস্ত্রী মহাশয় সব কটাই বাংলা ভাষায় লেখা হিসাবে ভেবেছিলেন। কিন্তু পরবর্তিকালে ডঃ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমূখ ভাষাতাত্ত্বিকেরা দেখিয়েছেন, শুধুমাত্র প্রথম পুথি চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ের ভাষাই বাংলা।
প্রসঙ্গঃ চর্যাপদ
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন যা কিছু আবিস্কৃত হয়েছে তার সবই হল ধর্মভাবপুষ্ট পদ্য সাহিত্য। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, প্রাচীন যুগের সাহিত্য নিতান্ত ধর্মচেতনা ও গোষ্ঠীভাব সাধনাকে আশ্রয় করে সৃষ্ট হলেও উদ্দেশ্য প্রচারের প্রবণতাকে অপ্রত্যাশিত ভাবে ছাপিয়ে উঠেছে স্রষ্টার মধুরসিক্ত মননকল্পনা। একারনে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নির্দশনকে ও নিতান্ত প্রাচীন বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এইরকম বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নির্দশন হল চর্যাপদ। এই চর্যাপদ কে নিয়ে দু একটা কথা আলোচনা করা হল -
রাত্রির অন্ধকার শেষ হলে দিনের আলো শুরু হয়। ভোরের প্রথম আলো যখন ফুটে ওঠে তখনও অন্ধকার জড়িয়ে থাকে। সেই আধ আলো আধ অন্ধকারে সবই কেমন অস্পষ্ট লাগে। এই ভোরের অস্পষ্টতায় পাখীরা জেগে ওঠে; তাদের কাকলী ছড়িয়ে দেয় আকাশে – বাতাসে। কিন্তু তাঁদের কলধ্বনির অর্থ সব বোঝা যায় না, কিন্তু তাঁদের আনন্দের অভিব্যাক্তি যে নতুন একটি দিনের শুরু হচ্ছে তারই আগমনী গান শোনা যায়। বাংলা সাহিত্য ও একদিন এমনি করে জন্ম নিয়েছিল। আর সেই জন্মলগ্নে পাখীর অস্পষ্ট কাকলীর মত বৌদ্ধ সাধন সঙ্গীত অপরিণত বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছিল। ওই সময়ে দেশে তখন সংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল। বর্তমান দিনে যেমন শিক্ষিত ওপরের মহলের ইংরেজি ভাষার প্রচলন আছে, সে যুগে ও অভিজাত কিংবা পদস্থ ব্যক্তিদের মধ্যেও সংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল বেশী। সর্ব কাজেই সংস্কৃত ভাষা চলত, সাধারন মানুষ যদিও তার কিছুই বুঝতো না। সবই তাদের কাছে অন্ধকারের মতই অস্পষ্ট থেকে যেত। বাংলা ভাষার প্রথম নির্দশন ‘চর্যাপদ’ বা ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ এই সন্ধিক্ষণে উষার আলোর মত জেগে উঠলো। চর্যাপদ আসলে বিভিন্ন পদকারদের রচিত সংকলন কোষগ্রন্থ। সদ্য জাত বাংলা ভাষাকে কাজে লাগিয়ে সর্বপ্রথম সহজিয়া মঠের বৌদ্ধ সাধকগণ কয়েকটি গান রচনা করেন, যাঁরা এই ধর্মের নতুন দীক্ষা নিচ্ছেন তাঁদের কাছেই নিগূঢ় এই তত্ত্বটি প্রচার করাই ছিল এই রচনার মূল উদ্দেশ্য। এই গানগুলি চর্যাগীতি বা চর্যপদ নামে পরিচিত। এই চর্যাপদ সাধন-ভজন মূলক রচনা এতে সহজিয়া বৌদ্ধ সাধকগণের ধর্ম, তত্ত্বকথা, দর্শন, চিন্তা ও সাধন প্রণালী ব্যক্ত হয়েছে। চর্যাগীতিতে যোগীদের আচার ব্যবহারের নির্দেশ আছে বটে, কিন্তু সেই নির্দেশ আধ্যাত্মিক।
আবিষ্কার ও তত্ত্বপঞ্জী:-
চর্যাপদ শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্যে নয়, নবীন ভারতীয় আর্যভাষা ও সাহিত্যের একটি প্রাচীনতম গ্রন্থ হিসাবে ও বিবেচিত। ডঃ প্রয়াত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় সর্বপ্রথম এই গ্রথের আবিষ্কর্তা। এশিয়াটিক সোসাইটির মেম্বার হিসাবে শাস্ত্রী মহাশয় তিনবার নেপালে যান, পুথি সংগ্রহের জন্য। শেষ একবার নেপালে যাল ১৯০৭ খ্রীঃ। তিনি নেপালের রাজদরবার থেকে তালপাতার লেখা কতকগুলি পুথির সন্ধান পান এবং সেগুলিকে “ হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা” নাম দিয়ে ১৯১৬ খ্রীঃ বাংলায় ১৩২৩ বঙ্গাব্দে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’ থেকে প্রকাশ করেন। এতে মোট চারটি খণ্ড ছিল - চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরোজব্রজের দোহা, কৃষ্ণাচার্যের দোহা ও ডাকার্ণব। শাস্ত্রী মহাশয় সব কটাই বাংলা ভাষায় লেখা হিসাবে ভেবেছিলেন। কিন্তু পরবর্তিকালে ডঃ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমূখ ভাষাতাত্ত্বিকেরা দেখিয়েছেন, শুধুমাত্র প্রথম পুথি চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ের ভাষাই বাংলা।
চর্যাপদের কবিগণ
আমরা আগের টপিকে আলোচনা করেছিলাম বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন চর্যাপদ কে নিয়ে। এবং সেই সাথে আমরা চর্যাপদের আবিষ্কার তথ্যপঞ্জি নিয়েও বিশদ আলোচনা করেছি। এবার আমরা চর্যাপদ এর বিষয়বস্তু ও কবি পরিচিতি সম্বন্ধে জেনে নেব। চর্যাপদের বিষয়বস্তু হল সহজিয়া দর্শন ও সাধন তত্ত্ব। পদকর্তাগণ সকলেই ছিলেন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য। অশ্রদ্ধাশীল সাধারণ মানুষ যাতে সাধনার গূঢ়তত্ত্ব অবগত হতে না পারে সেজন্য সিদ্ধাচার্যগণ তাদেরগুহ্য সাধনতত্ত্বকে প্রকাশ করতে গিয়ে দুরূহ দুর্বোধ্য রূপক-সাংকেতিক, প্রহেলিকাময় ভাষার ব্যবহার করেছেন। অনূন্য ২৩ জন পদকর্তার রচিত পদ পাওয়া গিয়েছে। আমরা তাঁদের মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য কবিদের ব্যক্তি পরিচয় সম্পর্কে জেনে নেব।
(১) লুইপা:-
লুইপা একজন বাঙালি কবি। তেঙ্গুরে বাঙালি বলেই লুইয়ের নাম উল্লেখ আছে। অধ্যাপক নির্মল দাশের অভিমত;- " চর্যাগীতি সংগ্রহের প্রথম কবি লুই। শুধু পদসংখ্যার ক্রমানুসারেই, তিব্বতি ঐতিহ্যে যে ৮৪ জন সিদ্ধাচার্যের নাম পাওয়া যায় লুই তাঁদের মধ্যে ও অন্যতম"। মহা মনিষী দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের সাথে তার পরিচয় ছিল। শ্রীজ্ঞান ১০৩৮ সালে বিক্রমশীল বিহার হতে তিব্বত যাত্রা করেছিলেন। সুতরাং অনুমান করা যেতে পারে দশম শতকের শেষ ভাগে অথবা একাদশ শতকের প্রথম ভাগে লুইপাদের সহজ তত্ত্ব প্রচারিত হয়েছিল। চর্যাপদে লুই প্রণীত দুটি পদ (১,২৯) সংকলিত হয়েছে।
(২) কাহ্ন পা বা কৃষ্ণাচার্য:-
'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ে'কৃষ্ণাচার্য বা কাহ্নপাদের তেরটি পদ সংগৃহীত হয়েছে। তারমধ্যে বারটি পদ শাস্ত্রী মহাশয় সম্পাদিত গ্রন্থে মুদ্রিত হয়েছে এবং অপর দুটি প্রবোধ বাগচী সম্পাদিত তিব্বতীয় অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে। পদরচনায় কাহ্নপাদ বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। শাস্ত্রী মহাশয়ের মতে,কাহ্নপাদ সবমিলিয়ে ৫৭ টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিব্বতীয় ৮৪ জন মহাসিদ্ধার নামের তালিকায় কানহ্ পাদ বা কনপ সপ্তদশ স্থানীয়। ৩৬ সংখ্যক চর্যাপদে কাহ্নপাদ নিজেকে জালন্ধরী পাদের শিষ্য বলে পরিচয় দিয়েছেন।
(৩) শান্তিপাদ:-
'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়' এ শান্তিপাদের ভনিতায় দুটি পদ(১৫,২৬) পাওয়া যায়। কিন্তু কবির আসল নাম জানা যায়নি। এশিয়াটিক সোসাইটির ৯৯০ সংখ্যক পুথির বিবরণে জানা যায় শান্তিদেব রাজার ছেলে ছিলেন। সংসার ত্যাগ করে তিনি প্রথমে মঞ্জুব্রজের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। শেষ জীবনে কবি বৌদ্ধ ভিক্ষু রূপে নালন্দায় বসবাস করেন। সেখানে তিনি সর্বদা শান্তি থাকেন বলে তাকে শান্তিদেব বলেঅভিহিত করা হতো।
(৪) ভুসুকু পা:-
"আশ্চর্যচর্যাচয়" গ্রন্থের ২৩ জন কবির মধ্যে একজন অন্যতম কবি ভুসুকু। জানা যায় ধর্মপালের রাজত্বকালে কবি বর্তমান ছিলেন। তাঁর জীবিতকালের শেষ সীমা ৮০০ খ্রিষ্টাব্দ। কবির জন্মস্থান নালন্দা। ইনি ছিলেন একজন অশ্বারোহী সৈনিক। পরবর্তীকালে তিনি ভিক্ষু এবং সিদ্ধ হন। রাজপুত্র রূপে কবির প্রকৃত নাম শান্তিদেব। তিনি চর্যাপদের আটটি পদ রচনা করেছেন। তবে কবি ভুসুকু এবং শান্তিদেব যে একই ব্যক্তি এনিয়ে সংশয় আছে।
(৫) সরহ পা:-
'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ে' সরহপাদের চারটি পদ সংকলিত হয়েছে। কবির সঠিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। তিব্বতীয় ৮৪ জন মহাসিদ্ধার তালিকায় সরহপাদের অপর নাম রাহুল ভদ্র। তবে কোন কোন পণ্ডিতের মতে, চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ের সরহ ভনিতার পদগুলি এক বা একাধিক সরহের রচনা বলে মনে করেন।
(৬)শবরপাদ:-
চর্যাকার শবরপাদের দুটি পদ 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ে' সংগৃহীত হয়েছে। কবির নামে নানা স্থানে নানা কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। আবার কারো কারো মতে শবরপাদ বাংলাদেশের কোনোও পাহাড়ি জাতি বিশেষ শবর হিসাবে অভিহিত করেছেন। নাগার্জুনপাদ তাকে বজ্রযান ধর্মে দীক্ষিত করেন। কিন্তু রাহুল সাংস্কৃত্যায়নের মতে শবরপাদ সরহের শিষ্য এবং লুইপাদের গুরু। শবরপাদ বজ্রযান বিষয়ে অনেক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। উক্ত গ্রন্থাবলীর মধ্যে "বজ্রযোগিনী সাধনা", "মহামুদ্রাবজ্রগীতি" প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
এছাড়াও চর্যাপদে আরো অন্যান্য পদকর্তা আছেন,যাঁদের ভূমিকা খুবই উল্লেখযোগ্য। আমরা সমস্ত পদকর্তার কথা উল্লেখ করতে পারেনি তবে বিশেষ কয়েকজন কবির কথা আমরা উপরিউক্ত ভাগে আলোচনা করেছি। সমস্ত viewers কিংবা ছাত্র ছাত্রী যদি চর্যাপদের আরো অন্যান্য কবির কথা কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় জানতে চাও তাহলে আমাকে comment করে লিখে পাঠিও। ধন্যবাদ।।
Literature / Literature written before the development of language
সাহিত্য
“সাহিত্য” শব্দের মধ্যে রয়েছে “সহিত” কথাটি । “সহিত” শব্দটি থেকে সাহিত্যের উৎপত্তি। অর্থাৎ ধাতুগত অর্থ ধরলে সাহিত্য শব্দের মধ্যে একটি মিলনের ভাব দেখতে পাওয়া যায়, সে যে কেবল ভাবে-ভাবে, ভাষায়-ভাষায়, গ্রন্থে-গ্রন্থে মিলন তা নয়, -“ মানুষের সহিত মানুষের, অতীতের সহিত বর্তমানে, দূরের সহিত নিকটে, অত্যন্ত অন্তরঙ্গ যোগসাধন। সাহিত্য ব্যাতিত আর কিছু তারই সম্ভব নহে”। বস্তুত; “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানবচরিত্র মানুষের হৃদয়ের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারন করিতেছে, যে সংগীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষায় রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য”।। ( সাহিত্যের তাৎপর্য ) সুতারাং , “নিজের কথা, অপরের কথা, বিশ্বজগতের কথা, সাহিত্যিকের মনোবীনায় যে সুরের ঝংকার তোলে তাঁর শিল্পসম্মত প্রকাশের নাম সাহিত্য”।।
* নিজের কথা বলতে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি ভালোলাগা ও ভালোবাসা।।
* অপরের কথা বলতে কবির নিজের কথা নয়, অপরের কথায় পরিবেশিত করেছে তার জারক রসে জারিত করে।।
* বিশ্বজগতের কথা বলতে কবি এখানে বাইরের ভূখণ্ডের আশেপাশের অবস্থার কথা বলেছে।।
* সাহিত্যর মনোবীনায় যে সুরের ঝংকার তোলে বলতে কোনো বিষয় সাহিত্যিকের অন্তরের অনুভূতি স্পর্শ পেয়ে যে রস রূপ নির্মাণ করে তোলে তারই কথা।
সাহিত্যের কাজ
‘সাহিত্যের বিচারক’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,- “অন্তরের জিনিসকে বাহিরের ভাবের জিনিসকে ভাষায়, নিজের জিনিসকে বিশ্বমানবের এবং ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলা সাহিত্যের কাজ”।
সাহিত্যর প্রকাশ
সাহিত্য জিনিসটাই শিল্পসম্মত একটা ব্যাপার। মনের ভাবকে সাহিত্যিকরা বিচিত্র বর্ণের , বিচিত্র রূপের, বিচিত্র ছন্দে প্রকাশ করে থাকেন। এক্ষেত্রে এ প্রসঙ্গে আসে প্রকাশের বাহন সেটা হল অর্থ যুক্ত শব্দ। সাহিত্যের যে শব্দ গুলো হওয়া প্রয়োজন তা হল অলংকার। এবং তার অর্থ যুক্ত শব্দে থাকবে ব্যাঞ্জনা । তবেই এটাই হল সাহিত্য।
Saturday, 24 March 2018
Turkish Invasion Of Bengal & Its Consequence / বাংলায় তুর্কী আক্রমণ ও তার ফলশ্রুতি
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম সাহিত্যিক নিদর্শন চর্যাপদ। এর রচনাকাল খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী। চর্যাপদের পর প্রায় আড়াইশো বছর বাংলা সাহিত্যের কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি। আর এই বাংলা সাহিত্যের বন্ধ্যাত্বের মূল কারণ হিসাবে তুর্কী আক্রমণকেই দায়ী করা হয়। এই তুর্কী আক্রমণ বাংলায় কোন আকস্মিক ঘটনা বা ভাগ্যের পরিহাস নয়- রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধোগতির অনিবার্য পরিণাম। দ্বাদশ শতাব্দী শেষার্ধে তুর্কী সেনাপতি বখতিয়ার খিলজী বিহার ও বাংলাদেশ বিজয়ের জন্য অভিযান শুরু করেন এবং ত্রয়োদশ শতকের একেবারে প্রথমে বাংলাদেশের সেন বংশীয় রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে বাংলাদেশে মুসলমান শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তুর্কীদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল বলপূর্বক অপরকে ধর্মান্তরিত করা, অপরের সংস্কৃতিকে বিধ্বস্ত করা। তারা ছিল ধর্মোন্মাদ, যুদ্ধবাজ ও সাহসী। তারা হিন্দু দেবদেবীর মঠ, মন্দির, শিক্ষায়তন, দেবমূর্তি প্রভৃতি ধ্বংস করে মসজিদ ও মুসলিম শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু তাই নয় নর-নারী নির্যাতন, হত্যা, গৃহদাহ প্রভৃতির মাধ্যমে তুর্কীরা ভয়াবহ তুর্কী নাচন শুরু করে। এ প্রসঙ্গে ডঃ নীহাররঞ্জন রায় বলেছেন;-" বখতিয়ারের নবদ্দীপ জয় এবং একশত বৎসর মধ্যে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়িয়া মুসলমান রাজশক্তির প্রতিষ্ঠা কিছু আকস্মিক ঘটনা নয়, ভাগ্যের পরিহাস ও নয়- রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধোগতির অনির্বায পরিণাম"।।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম সাহিত্যিক নিদর্শন চর্যাপদ। এর রচনাকাল খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী। চর্যাপদের পর প্রায় আড়াইশো বছর বাংলা সাহিত্যের কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি। আর এই বাংলা সাহিত্যের বন্ধ্যাত্বের মূল কারণ হিসাবে তুর্কী আক্রমণকেই দায়ী করা হয়। এই তুর্কী আক্রমণ বাংলায় কোন আকস্মিক ঘটনা বা ভাগ্যের পরিহাস নয়- রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধোগতির অনিবার্য পরিণাম। দ্বাদশ শতাব্দী শেষার্ধে তুর্কী সেনাপতি বখতিয়ার খিলজী বিহার ও বাংলাদেশ বিজয়ের জন্য অভিযান শুরু করেন এবং ত্রয়োদশ শতকের একেবারে প্রথমে বাংলাদেশের সেন বংশীয় রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে বাংলাদেশে মুসলমান শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তুর্কীদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল বলপূর্বক অপরকে ধর্মান্তরিত করা, অপরের সংস্কৃতিকে বিধ্বস্ত করা। তারা ছিল ধর্মোন্মাদ, যুদ্ধবাজ ও সাহসী। তারা হিন্দু দেবদেবীর মঠ, মন্দির, শিক্ষায়তন, দেবমূর্তি প্রভৃতি ধ্বংস করে মসজিদ ও মুসলিম শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু তাই নয় নর-নারী নির্যাতন, হত্যা, গৃহদাহ প্রভৃতির মাধ্যমে তুর্কীরা ভয়াবহ তুর্কী নাচন শুরু করে। এ প্রসঙ্গে ডঃ নীহাররঞ্জন রায় বলেছেন;-" বখতিয়ারের নবদ্দীপ জয় এবং একশত বৎসর মধ্যে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়িয়া মুসলমান রাজশক্তির প্রতিষ্ঠা কিছু আকস্মিক ঘটনা নয়, ভাগ্যের পরিহাস ও নয়- রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধোগতির অনির্বায পরিণাম"।।
তুর্কী বিজয়ের ফলশ্রুতি: সামাজিক পরিণাম:-
তুর্কী আক্রমণের প্রচণ্ড আঘাতে বাঙালির জীবন নানাদিক থেকে বিপন্ন ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে একথা ঠিকই কিন্তু পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সমাজ জীবনে এর সুফল ফলতে থাকে।
(ক) সামাজিক ভেদাভেদ:-
সেন রাজবংশের সময় দেশে কৌলিন্য প্রথা, বর্ণভেদ, জাতিভেদ, খুব কঠোর ভাবে বিদ্যমান ছিল। স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য, প্রায়শ্চিত্ত ও সংস্কার সেন যুগেই ব্যাপকভাবে প্রসারতা লাভ করে। বাঙালি সমাজে শ্রেণীবিভাগ থাকায় তথাকথিত উচ্চবর্ণীয়দের সঙ্গে নিম্ন শ্রেণীরদের কোন হৃদয়ের সংযোগ ছিল না। ফলে নিম্নবর্গের লোকেরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে ইসলামের নব্য মানবতার পরিচয় পেয়ে এই ধর্মের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়।
(খ) হিন্দু সমাজের সুস্পষ্ট বিভেদ:-
শ্রমজীবী ও কৃষিজীবী মানুষেরা সে যুগের কায়িক শ্রমের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতো। এদের আচার অনুষ্ঠান, পূজা পার্বণ, সংস্কৃতির সঙ্গে অভিজাত শ্রেণীর আচার অনুষ্ঠান, পূজা পার্বণ বা সংস্কৃতির কোন প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিলনা। ফলে হিন্দু সমাজের মধ্যে একটা সুস্পষ্ট বিভেদ নীতি গড়ে উঠেছিল।
(গ) অখন্ড বাঙালি জাতি:-
তুর্কী বিজয়ের ফলে বিজয়ী রাজশক্তির অত্যাচারের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গেলে অভিজাতরা সব বিভেদ, বিচ্ছেদ অবজ্ঞাকে বিসর্জন দিয়ে হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতিকে রক্ষার কাজে এগিয়ে গেলেন। রাষ্ট্রিক ঘূর্ণিঝড়ে আলোড়িত বাঙালি জাতি আর্য অনার্য, উচ্চ-নীচ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে একত্রে মিলিত হয়ে এক অখণ্ড বাঙালি জাতি গড়ে ওঠার সুযোগ পেল। ডঃ সুকুমার সেনে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন;-" আর্য- অনার্যের মধ্যে সংস্কৃতিগত ধর্মবিশ্বাসগত আচার-ব্যবহারগত ও ভাবধারাগত এইযে স্তরভেদ ইহা বিলুপ্ত হইয়া অখন্ড বাঙালি জাতি গঠিত হইয়া উঠিবার পক্ষে একটি প্রধান বস্তুর অভাব ছিল, দ্বিতীয় পক্ষের সংঘাত"।
(ঘ) হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতি:-
তুর্কী আক্রমণের ফলে কেবল উচ্চ-নিম্ন বর্ণভেদ তৈরি হয়েছিল তা নয়, হিন্দু মুসলিমদের মিলন ও সাধিত হয়েছিল। দুটি স্বাতন্ত্র সভ্যতা পরস্পরের সংস্পর্শে এসে পরস্পরকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠে। এবং স্বাভাবিকভাবে বাঙালি জীবনযাত্রা নানাভাবে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, ভাষা সংস্কৃতি ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে গ্রহণ-বর্জন নীতিতে নতুনত্ব প্রকাশিত হতে শুরু করল।
(ঙ) বাঙালি সমাজে অর্থনীতি প্রাধান্য:-
তুর্কী বিজয়ের পরে ভারতীয় জনজীবনের সঙ্গে যোগসূত্রে বাংলার কৃষিজ, শিল্পজাত সম্পদ বাঙলার বাইরে বিক্রিত হয়ে অর্থনীতিতে নতুন দিকের সূচনা করলো। কৃষিজীবী থেকে বহির্বাণিজ্য এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা যা বাংলার বর্ধিষ্ণু গ্রাম ধীরে ধীরে নগরে পরিণত হল।
(চ) হিন্দুত্ব বোধ সৃষ্টি:-
তুর্কী বিজয়ের মধ্য দিয়ে জাতিরূপে বাঙালিদের মধ্যে প্রথম হিন্দুত্ব বোধ জাগ্রত হল। তুর্কী আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ায়"হিন্দু" নাম সৃষ্টি হয়। বাঙালি জাতির পরিচয়, উপাধি, বাংলা স্থানের নাম প্রভৃতি বিষয়ে তুর্কী বিজয়ের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
তুর্কী বিজয়ের ফলশ্রুতি: সাহিত্যের প্রভাব:-
(ক) মঙ্গলকাব্যের শাখা:-
তুর্কী বিজয়ের বহুমুখী প্রভাবের অন্যতম হলো সাহিত্যের নতুন চেতনার প্রকাশ। তুর্কী শাসনকালে অর্থাৎ অন্ধকার যুগে সমাজের নিম্ন শ্রেণীর মানুষ বিপদ থেকে ত্রাণের জন্য মনষা-চণ্ডী ইত্যাদি দেবদেবীর কল্পনা করেছেন। পরবর্তীকালে এই সমস্ত লোকায়তিক দেবতা ক্রমশ উন্নততর হয়ে মঙ্গলকাব্যের দেবতারূপে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে লাগলো। রাষ্ট্রীয় অভিঘাতের আকস্মিক দিক প্রকাশ অনন্যপায় উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজের অনেক অনার্য দেবদেবীকে স্বীকার করে নিল। উচ্চ-নিম্ন বর্ণের এই সহজ যোগাযোগের ফলে মঙ্গলকাব্য নামক কাব্য ধারাটি শিল্পসম্মত রুপ পেয়ে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে এক আশ্চর্য সংযোজন রূপে প্রকাশ হলো।
(খ) অনুবাদ সাহিত্য শাখা:-
এই নবগঠিত বাঙালি জাতির সামনে সর্বভারতীয় পৌরাণিক হিন্দুত্বের একটি আদর্শকে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অনুভূতি হয়েছিল; রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতের কাহিনী অনুবাদের বাসনা এমনইভাবে জন্ম নিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ডঃ দীনেশচন্দ্র মন্তব্য করেছেন;-" মুসলমান, ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হইতেই আসুন না কেন, এদেশে আসিয়া সম্পূর্ণরূপে বাঙ্গালী হইয়া পড়িলেন"। অন্ধকার পর্বের অর্থাৎ ( ১২০১-১৪০০ ) প্রায় দুশো বছরে যেমন মঙ্গল দেব দেবীর পূজার্চ্চনার বিস্তার ঘটিয়েছে, তেমনি অপৌরাণিক জনসংস্কৃতির মর্জ্জায় রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতে পুরাণ কাহিনীর রস প্রবেশ করেছে। পৌরাণিক হিন্দুধর্মের আদর্শ সমাজ রক্ষার প্রয়োজনে এই তথ্যগুলি অনুবাদের প্রয়োজন দেখা দিল। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য সূচনায় ছিল ধর্মীয় সংস্কৃতিক ও প্রতিরোধের সাহিত্য। বলা যেতে পারে নব্য গঠিত বাঙালি জাতি বিশিষ্ট রূপে আত্মপ্রকাশের সাহিত্য।
সুতরাং এইভাবেই তুর্কী আক্রমণের ফলেই বাংলা সমাজে উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের মিলন হয়েছিল তেমনি হিন্দু-মুসলিম জাতির সমন্বয় ও ও সাধিত হয়েছে একান্ত সহজভাবে। শুধু তাই নয়, এরই ফল স্বরূপে সাংস্কৃতিক জীবনের বিস্তৃত বিকাশ ঘটেছিল স্বতঃস্ফূর্ত গতিতে। নতুন ভাবে জেগেছে সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা। তাই ঐতিহাসিক দিক থেকে তুর্কী আক্রমণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।।
Subscribe to:
Posts (Atom)
Labels
Tags
Popular
-
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে কৃষ্ণচরিত্রের অভিনবত্ব: দীর্ঘকাল ধরে পদাবলী সাহিত্য পাঠের সূত্রে কৃষ্ণচরিত্রের যে মহিমান্বিত, প্রেমিক অথচ সম্ভ...
-
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধা এবং পদাবলী সাহিত্যের রাধা কি এক? রাধা চরিত্রের তুলনামূলক আলোচনা কর। পদাবলী সাহিত্যে যে রাধা চরিত্রের সঙ্গে আমরা প...
-
বড়ু চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বাংলা ভাষায় রচিত পদাবলী সাহিত্যের আদি কবি রূপে সিকৃতি লাভ করে বড়ু চন্ডীদাস। কৃষ্ণলীলা বিষয়ক একখানি বৃ...
blogger-disqus-facebook