Showing posts with label charyapada. Show all posts
Showing posts with label charyapada. Show all posts

Monday, 26 March 2018

Language / Historical importance of Charyapada


 চর্যাপদের ভাষা:-

বাংলা ভাষার জন্মলগ্নে সাহিত্যিক নিদর্শন চর্যাপদ। বৌদ্ধ সাধকেরা চর্যার ভাষার মধ্য দিয়ে সাধনার গোপনীয়তা কে অনেকটা হেঁয়ালি ভঙ্গিতে ব্যক্ত করেছেন, তাই কোন কোন পন্ডিত এই ভাষাকে সন্ধ্যা ভাষাতে অভিহিত করেছেন। চর্যাপদের ভাষা সম্পর্কে শাস্ত্রী মহাশয়ের বক্তব্য;-" সন্ধ্যা ভাষার মানে আলো-আঁধারি ভাষা, কতক আলো কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায় খানিক বুঝা যায় না"। এই ভাষা সন্ধ্যায় ম্লান গোধুলীলগ্নের মত এক গভীর রহস্য আছে- কতক স্পষ্ট কতক অস্পষ্ট। অর্থাৎ বাইরে এক অর্থ, ভিতর এক অন্য অর্থ; বাইরে সাধারন অর্থ, ভিতরে সুগভীর আধ্যাত্বিকতা। কোন কোন পণ্ডিতদের মতে সন্ধ্যা ভাষা না হয়ে'সন্ধা' ভাষা যার অর্থ অভিপ্রেত বা অধিপ্রায়িক রচনা। যে শব্দের অভিষ্ঠ অর্থ অনুধ্যান করে বুঝতে হয়। যাতে অদীক্ষিত বা অন্য ধর্মাবলম্বীরা সহজিয়া সাধনার গূঢ় রহস্য বুঝতে না পারে এজন্য চর্যাপদকর্তাগণ সন্ধ্যা ভাষা ব্যবহার করেছেন। এই শব্দগুলি সাধন গত কতকগুলি রহস্যপূর্ণ ইঙ্গিত আছে, যা শুধু এই পথের পথিকরাই বুঝতে পারেন। সাধনার গোপনীয়তা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে পাড়া কতকগুলি কায়িক ও বাচনিক সংকেত সৃষ্টি করেছেন, এগুলির মাধ্যমে যোগীরা সম্প্রদায়ভুক্ত অন্য যোগীদের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান করতে বা তত্ত্বকথা আলোচনা করতেন। এই সংকেত এর তাৎপর্য কেবলমাত্র যোগীরাই বোধগম্য ছিল। সন্ধ্যা শব্দের কয়েকটি উদাহরণ দিলে বোধগম্য হবে;- ('হরিনা' শব্দের বাহ্যিক অর্থ মৃগ/ হরিণ, কিন্তু এর সন্ধ্যা অর্থ  চিত্ত বা মন।)('করুণা' শব্দের বাহ্যিক অর্থ মৈত্রী, কিন্তু এর সন্ধ্যা অর্থ বোধিচিত্ত)।।


 চর্যাপদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:-

সাহিত্য হল জীবনবেদ। মানব জীবনের বিচিত্র সুখ-দুঃখ ও আশা-নিরাশার কাহিনী নিয়ে সাহিত্য গড়ে ওঠে। তাই কোন রচনার ঐতিহাসিক মূল্য আছে কিনা বিচার করতে গেলে দেখতে হবে তা জীবন কাহিনী আশ্রিত কিনা এবং ভাষা, ছন্দ ও অলংকারের সমন্বয়ে সেই রচনা চমৎকারিত্ব লাভ করে রস সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে কিনা। ভাষাতত্ত্ব, ধর্ম মতবাদ ও দার্শনিকতা, সমাজ চিত্র, সাধন তত্ত্ব সাহিত্যে কাব্যমূল্যের দৃষ্টান্ত স্বরূপে চর্যাপদ ঐতিহাসিক গুরুত্ব লাভ করেছে।

প্রথমত, এ যাবৎ আবিষ্কৃত প্রাচীন যুগের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একমাত্র নিদর্শন।

দ্বিতীয়ত, চর্যাপদকে কেন্দ্র করেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সাহিত্যিক ঐতিহ্যের অভিযান শুরু হয়েছে।

তৃতীয়ত, চর্যাপদের প্রত্যেকটি পদের সূচনায় রাগ রাগিনী, তাল ও লয়ের উল্লেখ আছে। এ থেকে বোঝা যায় চর্যার পদগুলি গান হিসাবে গাওয়া হতো।

চতুর্থত, চর্যাপদের রূপক প্রতীকগুলির মধ্যে তৎকালীন সমাজ জীবন ও রাষ্ট্রনৈতিক জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে।

পঞ্চমত, সংস্কৃত চিত্রাত্মক/ চিত্রধর্মী শ্লোকের বদলে বাংলা গীতি ধর্মী পদ রচনার সূচনা।

ষষ্ঠত, চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রবেশদ্বার স্বরূপ। এই গ্রন্থের ভাষা মাগধী অপভ্রংশ স্তর অতিক্রম করে নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা রূপে সদ্য উদ্ভূত প্রত্ন বাংলাভাষার প্রামাণ্য উপকরণ।

সপ্তমত, বাংলা সাহিত্যেও চর্যার সুদূরপ্রসারী প্রত্যক্ষ প্রভাব ও তাৎপর্যপূর্ণ। চর্যার অনুবৃত্তি দেখা যায় সপ্তদশ শতাব্দীর নাথ সাহিত্য ও বাউল গানে।


 চর্যাপদ সাধন বিষয়ক রচনা হলেও মানব জীবনের সুখ-দুঃখের ভিত্তিতেই এর প্রতিষ্ঠা। গভীর মর্ত্য প্রীতি ও জীবন রস রসিকতা তাদের রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রূপ ও অরূপ জগত চর্যাপদে একাকার হয়ে গেছে। এই কারণগুলির জন্য চর্যাপদ ঐতিহাসিক মূল্য লাভ করে।

Social life in Charyapada / Literary value of charyapada

চর্যাপদে বর্ণিত সমাজ জীবনঃ-

কোন যুগের সাহিত্যই সমাজ নিরপেক্ষ নয়। চর্যাগীতির রচয়িতা সিদ্ধাচার্যগণ ব্যক্তিগত সাধনা আর সহজানন্দ উপলব্ধিকে তার নিজস্ব শিল্পের রীতিতে প্রকাশ করেছেন। সাধনা প্রত্যয়ের দিক থেকে সমস্ত চর্যাগান এর বিষয়বস্তু একই ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুস্নার কথা। কিন্তু সেই সাধন প্রনালী প্রত্যেক সাধকের আপন অনুভূতির রসে বৈচিত্র‍্য মন্ডিত হয়ে উঠেছে। তৎকালীন সাধারণ বাঙালির প্রতিদিনের ধূলিধূসরিত জীবন চিত্র, সুখ দুঃখ, হাসি কান্নার টুকরো টুকরো রেখাচিত্র জীবন্ত হয়ে উঠেছে এই সমস্ত পদগুলিতে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মনীন্দ্র মোহন বসুর উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য;- " যেহেতু কোন কবিই পারিপার্শ্বিকতাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করিতে পারে না, কখনও সচেতন, কখনও অচেতনভাবে পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব স্বীকার করিয়া বসেন। সেই জন্য চর্যার রচয়িতাগণ ও তাদের বাস্তব পরিমণ্ডলকে মাঝে মাঝে আভাসিত না করিয়া পারেন না।"

(১) ভৌগোলিক পরিবেশ:- 

চর্যাগীতি তে যে সমস্ত উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে তাতে বাংলাদেশের নানা প্রসঙ্গের অবতারণা করা হয়েছে। চর্যাপদে খাল-বিল, নদী-নালা, বিশেষত নৌকা যাত্রার অতিরিক্ত উল্লেখ থাকায় নদীমাতৃক বাংলাদেশেরই কথায় সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেমন কবি লিখেছেন;-"ভবণ ই গহণ গম্ভীর বেঁগে বাহী।/ দু আন্তে চিখিল মাঁঝে ন থাহী।।"

(২) সমাজ বিন্যাস:- 

চর্যাগীতিতে চিত্রিত সমাজচিত্রের রুপটি প্রধানত হিন্দু সমাজের। সেই সমাজের উঁচু শ্রেনীতে ব্রাহ্মণ এবং নিম্ন শ্রেণীতে ডোম, চন্ডাল, শবরদের অবস্থান ছিল। প্রকৃতপক্ষে চর্যাপদে নিম্ন শ্রেণীর জীবন কথাই বর্ণিত হয়েছে। বর্ণাশ্রম প্রথা কঠোরভাবে বিদ্যমান ছিল। নিম্ন শ্রেণীর মানুষেরা সভ্য সমাজ থেকে দূরে বসবাস করত। তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায় কাহ্নপাদের একটি পদে;-" নগর বাহিরে ডোম্বী তোহোরি কুড়িআ।/ছোই ছোই জাহসো ব্রাহ্ম নাড়িআ।।" ইত্যাদি পদে।

(৩)জীবিকা:- 

চর্যাগীতিতে যে ক'টি জীবিকা বা বৃত্তির ইঙ্গিত আছে, পা খুব একটা উচ্চমানের নয়। কায়িক পরিশ্রমই ছিল তাদের প্রধান সম্পদ। যেমন, কেউ কেউ ঝুড়ি,চাঙ্গড়ি, চুপড়ি ইত্যাদি তৈরি করত। এমন কি ডোম্বীরা খেয়া পারাপারের কাজ ও করত। শুধু তাই নয়, মাদুর বোনা, কাপড় বোনা, মাছ ধরা, মদ চোলাই করার কথা ও চর্যাগানে আছে। এমন কি হরিণ শিকার ও বাণিজ্য যাত্রার কথা ও জানা যায়। হরিণ শিকারের কাহিনীতে পুশু জীবনের অব্যক্ত মর্ম যন্ত্রণার ক্রন্দন ধ্বনিত হয়েছে;- " আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী।/খনহ ন ছাড় অ ভুসুকু অহেরী।।"

(৪) পারিবারিক জীবন যাপন:-

চর্যা যুগে পারিবারিক জীবন ছিল একান্নবর্তী শশুর, শাশুড়ি, ননদ, পুত্রবধূকে নিয়ে বিরাট সংসার। তবে সমাজের কোন কোন স্তরে ব্যভিচার ছিল।

(৫) আমোদ-প্রমোদ:- 

সেকালের মানুষেরা খেলাধুলার মাধ্যমে অবসর সময় কাটাতো। খেলাধুলার মধ্যে দাবা খেলা ছিল জনপ্রিয়;-"করুণা পিহাড়ি খেলহুঁ নববল"। এছাড়াও নাটক ও নৃত্য গীতের প্রতি বাঙালির বিশেষ একটা ঝোঁক ছিল। মেয়েরা নৃত্যগীতে খুব নিপুণা ছিল। চর্যাপদে বন্ধু নাটক ও অভিনয়ের কথা উল্লেখ আছে;-" বন্ধু নাটক বিসমা হোই"।। নগরের ধনী ব্যক্তিরা ছিল বিলাসী। তারা পালঙ্কে শুয়ে কপ্পুর মেশানো পান খেতেন। সে সময় মদ্যপানে রেওয়াজ ছিল খুবই জোরদার।

(৬) বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়:- 

চর্যার সময়ে বৈদিক আচার-অনুষ্ঠানের প্রচলন ছিল। তখনকার ব্রাহ্মণ,দন্ডী, জৈন, সন্ন্যাসী প্রভৃতিদের প্রতি চর্যাকারেরা কটাক্ষ করেছেন। সিদ্ধাচার্যের মাপে ব্রাহ্মণরা বেদের কিছুই  বোঝেনা। চর্যাপদের একটি পদে আছে;-"সু অল সমাহি অ কাহি করিঅই।/সুখদুখেঁতে নিচিত মরিঅই"।।

যাই হোক যুগান্তরে পরেও চর্যাপদের মধ্যে সদ্য মুকুলিত বাংলা ভাষায় অঙ্কিত সমাজ ও সংসার চিত্র অম্লান আছে। কবিগণ আধ্যাত্ম পথের যাত্রী হয়েও বিস্মৃত হতে পারেননি জীবনের মূল স্রোত থেকে। চর্যার বিষয়বস্তু বা লক্ষ্য আধ্যাত্মিক হলেও এর জীবনবোধের উৎস সম্পূর্ণরূপেই লৌকিক জগতের বিষয়।একারণেই চর্যাপদে সেই সময়কার বাস্তব সমাজ জীবনের ছবিকে দেখতে পায়।

চর্যাপদের সাহিত্যমূল্য:-

সাহিত্যের অপর নাম জীবনবেদ। চর্যাপদ গুলির অবলম্বিত বিষয়, মোটেই সাহিত্যোচিত রস বস্তু নয়। বৌদ্ধ সহজিয়ারা তাদের সাধন তত্ত্ব প্রণালী এগুলি উপজীব্য। ধর্মকেন্দ্রিক রচনা হলেও চর্যাপদ গুলি হয়ে উঠেছে সাহিত্য সম্পদে সমৃদ্ধ। ধর্মীয় দার্শনিক তত্ত্ব কে কাব্যরূপ দেওয়ার ক্ষমতা নিঃসন্দেহে উচ্চাঙ্গের কবি প্রতিভার নিদর্শন। চর্যাপদের কবিদের ছন্দ, শব্দ যোজনা এবং অলঙ্কারের ব্যবহার প্রশংসনীয়। শ্লেষ, অনুপ্রাস, উপমা-রূপক ইত্যাদি অলংকারের সার্থক প্রয়োগ চর্যাপদে শিল্প সমুজ্জ্বল রূপ পেয়েছে।

(১) অলংকার:-

সিদ্ধাচার্যগণ চর্যাপদ শুধুমাত্র তত্ত্বই পরিবেশন করতে চেয়েছেন। সন্ধ্যা ভাষার আড়ালে তারা শব্দের লক্ষণা শক্তিকে আবিষ্কার করেছিলেন। এবং পদগুলিতে আমরা উপমা, বিপরীত ভাষণ ইত্যাদি অলংকারের সন্ধান পায়। যেমন;-"নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী।/বুদ্ধ নাটক বিষমা হোই।।" এখানে নাচন্তি ও গান্তি শব্দের সংযুক্ত ব্যঞ্জন 'ন্ত' ক্রমানুসারে ধ্বনিত হয়, এটি ছেকানুপ্রাসের উদাঃ।

(২) তাল এবং ছন্দ:-

চর্যাপদ গুলি গান এবং কবিতা আকারে সজ্জিত। প্রতিটি কবিতার শিরোনামে রাগের উল্লেখ আছে। বেশিরভাগ পদই রচিত হয়েছিল প্রত্নমাত্রাবৃত্ত ছন্দে। তাতে রুদ্ধদল ও দীর্ঘস্বর দ্বিমাত্রিক। যেমন;-"কা আ ত রু ব র/প ঞ্চ বি ডা ল"(৮+৮)।।

(৩) চিত্র ধর্ম, সংগীত ধর্ম এবং গীতি প্রাণতা:-

হৃদয় উৎসারিত অনুভূতির প্রকাশ করতে গিয়ে নতুন নতুন চিত্র কল্পনা, সাধন প্রনালী ও রূপ রচনা করেছেন এই বৌদ্ধ মঠের সাধকেরা। এসকল চিত্ত কল্পনায় বর্ণনীয় বস্তুতে লাবণ্য ও সৌন্দর্য ব্যক্ত করে চর্যাপদকর্তাগণ অনন্য কবিত্বশক্তির পরিচয় দিয়েছেন। এছাড়াও প্রত্যেকটি পদে গীতি প্রাণতা লক্ষণীয়। যেমন;-"উঁচা উঁচা পাবত তঁহি বসই সবরী বালী।/মোরঙ্গি পীচ্ছ পরিহণ সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী।।" মনীষী হার্ডসনের মতে;- " Personal or subjective poetry or the poetry self expressions or self delineation."

(৪) ছোট ছোট গল্প বা কাহিনী প্রসঙ্গ:-

চর্যাপদের বিভিন্ন পদে আমরা ছোট ছোট গল্প ও কাহিনীর প্রসঙ্গ খুঁজে পায়। সেগুলি আজকের গল্পের মত না হলেও মূলত কাহিনীর মূলসূত্র পাওয়া যায়। যেমন;-" টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী/ হাঁড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী

(৫) সাহিত্যরস:-

চর্যাপদ হল আধ্যাত্ম সংগীত। এজন্য শান্ত রস হল এর প্রধান রস। এছাড়াও করুণরস, হাস্যরস ও অদ্ভুত রসের সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন;- "দুলি দুহিপিটা ধরণ ন জাই।/রুখের তেন্তুলি কুম্ভিরে খা অ।।"

(৬) প্রবাদ প্রবচন:-

বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য চর্যাপদকর্তাগণ কোন কোন বিষয় চর্যাপদের মধ্যে চিরন্তন যুক্তি ও প্রবাদ বাক্যের মর্যাদা দিয়েছেন। যেমন;-" আপনা মাংসে হরিণা বৈরী।" নিজের সুস্বাদু মাংসের জন্য হরিণ নিজের শত্রু।

(৭) ধাঁধা প্রসঙ্গ:-

সন্ধ্যাভাষার আড়ালের মধ্যে দিয়ে চর্যাকারেরা চর্যাপদে ধাঁধার ব্যবহার করেছেন। যেগুলি আমাদের ধাঁধিয়ে দেয়। যেমন;-"জো সো বুধি সোই নিবুধী।/জো সে চোর সোই সাধী।।"

(৮) মিষ্টিক কবিতা:-

তত্ত্ববাদী সাধকেরা ছিলেন জীবন প্রেমিক কবি। তত্ত্ব প্রধান হলেও চর্যাপদের তত্ত্ব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এই জীবন চিত্রগুলি  লোকজগতের অভিজ্ঞতা, লোক চরিত্র চিত্র দক্ষতা নয়, জীবনরস রসিকতায় ভাষ্য। চর্যাপদ জ্ঞানের বিষয় নয়- ভাবের বিষয়, তত্ত্বের মৃণালে কাব্যের শতদল।



Context of Charyapada/ Writer of Charyapada প্রসঙ্গঃ চর্যাপদ

প্রসঙ্গঃ  চর্যাপদ

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন যা কিছু আবিস্কৃত হয়েছে তার সবই হল ধর্মভাবপুষ্ট পদ্য সাহিত্য। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, প্রাচীন যুগের সাহিত্য নিতান্ত ধর্মচেতনা ও গোষ্ঠীভাব সাধনাকে আশ্রয় করে সৃষ্ট হলেও উদ্দেশ্য প্রচারের প্রবণতাকে অপ্রত্যাশিত ভাবে ছাপিয়ে উঠেছে স্রষ্টার মধুরসিক্ত মননকল্পনা। একারনে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নির্দশনকে ও নিতান্ত প্রাচীন বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এইরকম বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নির্দশন হল চর্যাপদ। এই চর্যাপদ কে নিয়ে দু একটা কথা আলোচনা করা হল -

রাত্রির অন্ধকার শেষ হলে দিনের আলো শুরু হয়। ভোরের প্রথম আলো যখন ফুটে ওঠে তখনও অন্ধকার জড়িয়ে থাকে। সেই আধ আলো আধ অন্ধকারে সবই কেমন অস্পষ্ট লাগে। এই ভোরের অস্পষ্টতায় পাখীরা জেগে ওঠে; তাদের কাকলী ছড়িয়ে দেয় আকাশে – বাতাসে। কিন্তু তাঁদের কলধ্বনির অর্থ সব বোঝা যায় না, কিন্তু তাঁদের আনন্দের অভিব্যাক্তি যে নতুন একটি দিনের শুরু হচ্ছে তারই আগমনী গান শোনা যায়। বাংলা সাহিত্য ও একদিন এমনি করে জন্ম নিয়েছিল। আর সেই জন্মলগ্নে পাখীর অস্পষ্ট কাকলীর মত বৌদ্ধ সাধন সঙ্গীত অপরিণত বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছিল। ওই সময়ে দেশে তখন সংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল। বর্তমান দিনে যেমন শিক্ষিত ওপরের মহলের ইংরেজি ভাষার প্রচলন আছে, সে যুগে ও অভিজাত কিংবা পদস্থ ব্যক্তিদের মধ্যেও সংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল বেশী। সর্ব কাজেই সংস্কৃত ভাষা চলত, সাধারন মানুষ যদিও তার কিছুই বুঝতো না। সবই তাদের কাছে অন্ধকারের মতই অস্পষ্ট থেকে যেত। বাংলা ভাষার প্রথম নির্দশন ‘চর্যাপদ’ বা ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ এই সন্ধিক্ষণে উষার আলোর মত জেগে উঠলো। চর্যাপদ আসলে বিভিন্ন পদকারদের রচিত সংকলন কোষগ্রন্থ। সদ্য জাত বাংলা ভাষাকে কাজে লাগিয়ে সর্বপ্রথম সহজিয়া মঠের বৌদ্ধ সাধকগণ কয়েকটি গান রচনা করেন, যাঁরা এই ধর্মের নতুন দীক্ষা নিচ্ছেন তাঁদের কাছেই নিগূঢ় এই তত্ত্বটি প্রচার করাই ছিল এই রচনার মূল উদ্দেশ্য। এই গানগুলি চর্যাগীতি বা চর্যপদ নামে পরিচিত। এই চর্যাপদ সাধন-ভজন মূলক রচনা এতে সহজিয়া বৌদ্ধ সাধকগণের ধর্ম, তত্ত্বকথা, দর্শন, চিন্তা ও সাধন প্রণালী ব্যক্ত হয়েছে। চর্যাগীতিতে যোগীদের আচার ব্যবহারের নির্দেশ আছে বটে, কিন্তু সেই নির্দেশ আধ্যাত্মিক।

আবিষ্কার ও তত্ত্বপঞ্জী:-

চর্যাপদ শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্যে নয়, নবীন ভারতীয় আর্যভাষা ও সাহিত্যের একটি প্রাচীনতম গ্রন্থ হিসাবে ও বিবেচিত। ডঃ প্রয়াত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় সর্বপ্রথম এই গ্রথের আবিষ্কর্তা। এশিয়াটিক সোসাইটির মেম্বার হিসাবে শাস্ত্রী মহাশয় তিনবার নেপালে যান, পুথি সংগ্রহের জন্য। শেষ একবার নেপালে যাল ১৯০৭ খ্রীঃ। তিনি নেপালের রাজদরবার থেকে তালপাতার লেখা কতকগুলি পুথির সন্ধান পান এবং সেগুলিকে “ হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা” নাম দিয়ে ১৯১৬ খ্রীঃ বাংলায় ১৩২৩ বঙ্গাব্দে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’ থেকে প্রকাশ করেন। এতে মোট চারটি খণ্ড ছিল -  চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরোজব্রজের দোহা, কৃষ্ণাচার্যের দোহা ও ডাকার্ণব। শাস্ত্রী মহাশয় সব কটাই বাংলা ভাষায় লেখা হিসাবে ভেবেছিলেন। কিন্তু পরবর্তিকালে ডঃ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমূখ ভাষাতাত্ত্বিকেরা দেখিয়েছেন, শুধুমাত্র প্রথম পুথি চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ের ভাষাই বাংলা।

চর্যাপদের কবিগণ

আমরা আগের টপিকে আলোচনা করেছিলাম বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন চর্যাপদ কে নিয়ে। এবং সেই সাথে আমরা চর্যাপদের আবিষ্কার তথ্যপঞ্জি নিয়েও বিশদ আলোচনা করেছি। এবার আমরা চর্যাপদ এর বিষয়বস্তু ও কবি পরিচিতি সম্বন্ধে জেনে নেব। চর্যাপদের বিষয়বস্তু হল সহজিয়া দর্শন ও সাধন তত্ত্ব। পদকর্তাগণ সকলেই ছিলেন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য। অশ্রদ্ধাশীল সাধারণ মানুষ যাতে সাধনার গূঢ়তত্ত্ব অবগত হতে না পারে সেজন্য সিদ্ধাচার্যগণ তাদেরগুহ্য সাধনতত্ত্বকে প্রকাশ করতে গিয়ে দুরূহ দুর্বোধ্য রূপক-সাংকেতিক, প্রহেলিকাময় ভাষার ব্যবহার করেছেন। অনূন্য ২৩ জন পদকর্তার রচিত পদ পাওয়া গিয়েছে। আমরা তাঁদের মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য কবিদের ব্যক্তি পরিচয় সম্পর্কে জেনে নেব।


(১) লুইপা:-

লুইপা একজন বাঙালি কবি। তেঙ্গুরে বাঙালি বলেই লুইয়ের নাম উল্লেখ আছে। অধ্যাপক নির্মল দাশের অভিমত;- " চর্যাগীতি সংগ্রহের প্রথম কবি লুই। শুধু পদসংখ্যার ক্রমানুসারেই, তিব্বতি ঐতিহ্যে যে ৮৪ জন সিদ্ধাচার্যের নাম পাওয়া যায় লুই তাঁদের মধ্যে ও অন্যতম"। মহা মনিষী দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের সাথে তার পরিচয় ছিল। শ্রীজ্ঞান ১০৩৮ সালে বিক্রমশীল বিহার হতে তিব্বত যাত্রা করেছিলেন। সুতরাং অনুমান করা যেতে পারে দশম শতকের শেষ ভাগে অথবা একাদশ শতকের প্রথম ভাগে লুইপাদের সহজ তত্ত্ব প্রচারিত হয়েছিল। চর্যাপদে লুই প্রণীত দুটি পদ (১,২৯) সংকলিত হয়েছে।

(২) কাহ্ন পা বা কৃষ্ণাচার্য:-

'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ে'কৃষ্ণাচার্য বা কাহ্নপাদের তেরটি পদ সংগৃহীত হয়েছে। তারমধ্যে বারটি পদ শাস্ত্রী মহাশয় সম্পাদিত গ্রন্থে মুদ্রিত হয়েছে এবং অপর দুটি প্রবোধ বাগচী সম্পাদিত তিব্বতীয় অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে। পদরচনায় কাহ্নপাদ বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। শাস্ত্রী মহাশয়ের মতে,কাহ্নপাদ সবমিলিয়ে ৫৭ টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিব্বতীয় ৮৪ জন মহাসিদ্ধার নামের তালিকায় কানহ্ পাদ বা কনপ সপ্তদশ স্থানীয়। ৩৬ সংখ্যক চর্যাপদে কাহ্নপাদ নিজেকে জালন্ধরী পাদের শিষ্য বলে পরিচয় দিয়েছেন।

(৩) শান্তিপাদ:-

'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়' এ শান্তিপাদের ভনিতায় দুটি পদ(১৫,২৬) পাওয়া যায়। কিন্তু কবির আসল নাম জানা যায়নি। এশিয়াটিক সোসাইটির ৯৯০ সংখ্যক পুথির বিবরণে জানা যায় শান্তিদেব রাজার ছেলে ছিলেন। সংসার ত্যাগ করে তিনি প্রথমে মঞ্জুব্রজের শিষ্যত্ব  গ্রহণ করেছিলেন। শেষ জীবনে কবি বৌদ্ধ ভিক্ষু রূপে নালন্দায় বসবাস করেন। সেখানে তিনি সর্বদা শান্তি থাকেন বলে তাকে শান্তিদেব বলেঅভিহিত করা হতো।

(৪) ভুসুকু পা:-

"আশ্চর্যচর্যাচয়" গ্রন্থের ২৩ জন কবির মধ্যে একজন অন্যতম কবি ভুসুকু। জানা যায় ধর্মপালের রাজত্বকালে কবি বর্তমান ছিলেন। তাঁর জীবিতকালের শেষ সীমা ৮০০ খ্রিষ্টাব্দ। কবির জন্মস্থান নালন্দা। ইনি ছিলেন একজন অশ্বারোহী সৈনিক। পরবর্তীকালে তিনি ভিক্ষু এবং সিদ্ধ হন। রাজপুত্র রূপে কবির প্রকৃত নাম শান্তিদেব। তিনি চর্যাপদের আটটি পদ রচনা করেছেন। তবে কবি ভুসুকু এবং শান্তিদেব যে একই ব্যক্তি এনিয়ে সংশয় আছে।

(৫) সরহ পা:-

'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ে' সরহপাদের চারটি পদ সংকলিত হয়েছে। কবির সঠিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। তিব্বতীয় ৮৪ জন মহাসিদ্ধার তালিকায় সরহপাদের অপর নাম রাহুল ভদ্র। তবে কোন কোন পণ্ডিতের মতে, চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ের সরহ ভনিতার পদগুলি এক বা একাধিক সরহের রচনা বলে মনে করেন।

(৬)শবরপাদ:-

চর্যাকার শবরপাদের দুটি পদ 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ে' সংগৃহীত হয়েছে। কবির নামে নানা স্থানে নানা কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। আবার কারো কারো মতে শবরপাদ বাংলাদেশের কোনোও পাহাড়ি জাতি বিশেষ শবর হিসাবে অভিহিত করেছেন। নাগার্জুনপাদ তাকে বজ্রযান ধর্মে দীক্ষিত করেন। কিন্তু রাহুল সাংস্কৃত্যায়নের মতে শবরপাদ সরহের শিষ্য এবং লুইপাদের গুরু। শবরপাদ বজ্রযান বিষয়ে অনেক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। উক্ত গ্রন্থাবলীর  মধ্যে "বজ্রযোগিনী সাধনা", "মহামুদ্রাবজ্রগীতি" প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

এছাড়াও চর্যাপদে আরো অন্যান্য পদকর্তা আছেন,যাঁদের ভূমিকা খুবই উল্লেখযোগ্য। আমরা সমস্ত পদকর্তার কথা উল্লেখ করতে পারেনি তবে বিশেষ কয়েকজন কবির কথা আমরা উপরিউক্ত ভাগে আলোচনা করেছি। সমস্ত viewers কিংবা ছাত্র ছাত্রী যদি চর্যাপদের আরো অন্যান্য কবির কথা কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় জানতে চাও তাহলে আমাকে comment করে লিখে পাঠিও। ধন্যবাদ।।

History of Buddhism / Described theoretical theory of Charyapada

বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস


বৌদ্ধ ধর্ম মোটামুটিভাবে দু'ভাগে বিভক্ত- হীনযান বৌদ্ধ ধর্ম ও মহাজান বৌদ্ধ ধর্ম। বুদ্ধদেব নিজে কোন রূপ ধর্মগ্রন্থ রচনা করে যাননি। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর উপদেশাবলী সংগ্রহ করার জন্য প্রথমত রাজগৃহ একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর প্রায় এক বছর পর বৈশালীতে দ্বিতীয় সভার অধিবেশন হয়। এরপরে মহারাজ অশোকের আমলে পাটালিপুত্রে তৃতীয় সভা এবং মহারাজ কনিষ্কের রাজত্বকালে চতুর্থ সভার অধিবেশন হয়েছিল। এইসকল ধর্মসভায় বুদ্ধদেবের উপদেশ অবলম্বন করে বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থ রচিত হয়েছিল। এর মধ্যে সূত্র, বিনয় ও অভিধর্ম নামক তিন পিটক বা পেটিকা নামক সংগ্রহ গ্রন্থই প্রধান। এই সকল গ্রন্থই পালি ভাষায় রচিত। গ্রন্থ গুলির সন্ধান সিংহল, ব্রহ্ম, ও শ্যাম প্রভৃতি দেশে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের দর্শনের যে বিবরণ পাওয়া যায় তাকেই প্রাচীন মতেই নাম হল হীনযান। এরপর খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকের দিকে মহাযান- সম্প্রদায়ের অভ্যুত্থান ঘটে। নাগার্জুন, অসঙ্গ, বসুবন্ধু প্রভৃতির আচার্যগণ প্রাচীন শাস্ত্রের ব্যাখ্যা করে সংস্কৃত ভাষায় তাদের মতামত প্রচার করেছেন। এই হল মহাযান মত। তিব্বত, চীন, জাপান প্রভৃতি দেশে এই মত বিস্তৃতি লাভ করে।


হীনযান ও মহাযান:

হীনযান ও মহাযান সম্প্রদায় মধ্যে বিরোধ চরম আদর্শ, উপদেশ, উপদেশের প্রয়োগ, সাধনার আলম্বন ও সাধন কালের পরিমাণ নিয়ে। এসকল বিষয়ে প্রাচীনেরা হীন ছিলেন বলেই তারা হীনযানী। প্রাচীন স্থবির বাদী বা থেরবাদীদের চরম আদর্শ ছিল- শূন্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে নির্বাণ অবলম্বন করে অর্হত্ত লাভ করা। কিন্তু মহাযানীদের উদ্দেশ্য ছিল আরোও উদার। তাঁরা বললেন;-" নির্বাণ লাভ করে 'অর্হৎ' হলে চলবে না; দুঃখ প্রপীড়িত বিশ্ব জীবের মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আত্ম মুক্তির ত্যাগ করতে হবে, নির্বাণ লাভের উপযুক্ত হলেও নির্বাণ ত্যাগ করে শূন্যতায় প্রতিষ্ঠিত থেকেই মহা করুণা অবলম্বনে বিশ্ব জীবের মুক্তির জন্য অনন্তকাল ধরে কুশল কর্ম করে যেতে হবে এটাই হল মহাযানীর পথ"।।

বজ্রযান ও সহজযান:

বিভিন্ন ধরনের ধর্মবিশ্বাস ও প্রচলিত সাধন পদ্ধতি ক্রম প্রবেশের ফলে মহাযান মত পরিবর্তিত ও বিশ্লিষ্ট হয় দেখা দিল দুটি মত- 'পারমিতানয়' ও 'মন্ত্রনয়'।'পারমিতানয়'  পরিকল্পিত মহাযানের বিশুদ্ধ দার্শনিক তত্ত্ব আশ্রয় করে। আর 'পারমিতানয়'এ অনুশীলনের উপরে গুরুত্ব না দিয়ে বিভিন্ন প্রকারের মন্ত্রের উপরে গুরুত্ব আরোপ করে সৃষ্ট  হল 'মন্ত্রনয়'। আবার এই 'মন্ত্রনয়' এর সঙ্গে নানা প্রকার দেবদেবীর পূজার্চনা, ধ্যান-ধারণা, তান্ত্রিক ক্রিয়া বিধি,গুহ্য যোগ সাধনা ইত্যাদি প্রযুক্ত হয় বজ্রযান উদ্ভূত হল। 'বজ্র' শব্দের বৌদ্ধ তান্ত্রিক অর্থ শূন্যতা, বজ্রযান তাই শূন্যতা-যান। আর অন্যদিকে বজ্রযান পন্থী একদল সাধকের কতকগুলি বিশিষ্ট মত ও সাধন পদ্ধতি অনুসরণ করে পরবর্তীকালে সহজযান নামক এক বিশেষ  সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। এদের সাধ্য ও সহজ, সাধন ও সহজ; তাই এরা সহজিয়া সাধক রূপে খ্যাত. সহজ শব্দে অর্থ হল সহ-জাত। যে ধর্ম প্রত্যেক জীব বা বস্তুর জন্ম থেকেই উৎপন্ন তারাই বিরাজ করে। সহজিয়াগণের মূল আদর্শ এই সহজ রূপকে উপলব্ধি করে মহাসুখে মগ্ন হওয়া। এছাড়াও সহজিগণ কখনো ও সাধনার জন্য বক্রতা অবলম্বন করতেন না- সহজ সরল পথই তাঁদের সাধন জীবনের একমাত্র অবলম্বন।

চর্যাপদে বর্ণিত সাধন তত্ত্ব:

বৌদ্ধ সহজিয়াগণের সাধনা মূলত তান্ত্রিক সাধনা। তন্ত্র সাধনা হল দেহ-সাধনা- দেহকে যন্ত্র করে তার ভেতরেই পরম সত্যকে উপলব্ধি করার সাধনা। তান্ত্রিকদের মতে দেবো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্র রূপ- ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যা কিছু সত্য নিহিত আছে তা এই দেহভান্ডের মধ্যে ও রয়েছে। সহজিয়াগণ বলেন, দেহের মধ্যে অবস্থান করছে যে সহজ স্বরূপ তাই হল বুদ্ধ -স্বরূপ। চর্যাপদ গুলির মধ্যে এই তন্ত্র সাধনা তথা দেহ সাধনার কথা বহুস্থলে উল্লিখিত হয়েছে। পদকর্তাগণ বারবার বলেছেন-"নিঅড়ি বোহি মা জাহুরে লাঙ্ক"। অর্থাৎ এই দেহেই আছে বোধি তাকে লাভ করার জন্য লঙ্কায় যাবার প্রয়োজন নেই। সহজিয়য়াগণ দেহের মধ্যে চারটি চক্র বা পদ্ম কল্পনা করেছেন। প্রথম চক্র অবস্থিত নাভিতে, যাকে বলা হয় 'নির্মাণ চক্র'। দ্বিতীয় চক্র হৃদয়ে, যাকে বলা হয় 'ধর্মচক্র'। তৃতীয় চক্র কন্ঠে, যাকে বলা হয় 'সম্ভোগ চক্র'। এবং চতুর্থ চক্রের অবস্থান মস্তকে, যাকে বলা হয় 'সহজচক্র বা মহাসুখচক্র'। যোগসাধনার দিক থেকে দেখা যায় এই দেহের মধ্যে তিনটি প্রধান নাড়ী আছে। একটি 'বামগা', প্রাণবাহী শ্বাসবাহী নাড়ী( হিন্দু তন্ত্র মতে -ইড়া ) বলা হয়। অপরটি 'দক্ষিণগা',প্রশ্বাসবাহী নাড়ী(হিন্দু তন্ত্র মতে- পিঙ্গলা) বলা হয়। এবং আরেকটি নাড়ী আছে তার নাম হলো 'মধ্যগা'নাড়ী, যাকে (বৌদ্ধ তন্ত্র মতে অবধূতিকা বা হিন্দু তন্ত্র মতে -সুষুম্না বলা হয়)। সাধনার ক্ষেত্রে বামগা- দক্ষিণগা এই নাড়ী দুটিকে শূন্যতা- করুণা, প্রজ্ঞা -উপায়, নিবৃত্তি-প্রবৃত্তি, গ্রাহক- গ্রাহ্য, আলি- কালী, দিবা-রাত্রি, চন্দ্র-সূর্য, ভব- নির্মাণ ইত্যাদি অনেক নামে অভিহিত করা হয়েছে। এই নাড়ী দুটি দ্বৈত তত্ত্বের প্রতীক। তৃতীয় নাড়ীটি( অবধূতি বা অবধূতিকা)অদ্বয় বোধিচিত্ত বা সহজানন্দ লাভের জন্য মধ্য মার্গের প্রতিক। চার্যার বহু স্থানে নানাভাবে এই মধ্যপথে কথা বলা হয়েছে। কারণ বৌদ্ধ সহজিয়াগণের আসল সাধনা হল- সর্ব প্রকারের দ্বৈতবিবর্জিত হয়ে অদ্বয় মহাসুখে বা সহজরূপে প্রতিষ্ঠিত থাকা। তন্ত্র সাধন মতে প্রথমে বামা ও দক্ষিণা নাড়ী দুটিকে নিঃস্বভাবীকৃত করতে হবে।এদের "ক্রিয়াধারা স্বাভাবিক ভাবে নিম্নগা; এই নিম্নগা ধারাকে যোগের সাহায্যে প্রথমে বিশুদ্ধ করিয়া রুদ্ধ করিতে হইবে- তাহার পরে সমস্ত ধারাকে একীকরণের সাধনা; যখন সব ধারা একীকৃত হইল মধ্যমার্গে- তখন সেই মধ্যমার্গে তাহাকে করিতে হইবে উর্দ্ধগা। সেই উর্দ্ধগা ধারায় আনন্দধারা, সেই আনন্দের মধ্যে অনুভূতি তারতম্য আছে; প্রথমে যে উর্ধ স্পন্দনাত্মক আনন্দনাভূতি তাহার নাম আনন্দ,- দ্বিতীয়ানুভূতি হইল পরমানন্দ- তৃতীয়ানুভূতি বিরামানন্দ- চতুর্থানুভূতি হইল সহজানন্দ। এই চতুর্থানুভূতি সহজানন্দই  হইল চতুর্থশূন্য- প্রকৃতি  প্রভাস্বর সর্বশূন্য।  বোধিচিত্ত  উষ্ণীষ কমলস্থিত চন্দ্র,- সহজানন্দেই ঘটে সেই চন্দ্র হইতে অমৃত ক্ষরণ"।। (ডঃ শশীভূষণ দাশগুপ্ত)




Popular